বাবা-মায়ের সঙ্গে দাদা বাড়ি আসা হলো না জায়ানের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৩:১৫ এএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

নভেম্বর মাসে বাবা-মায়ের সঙ্গে দাদা বাড়িতে প্রথমবারের মতো আসার কথা ছিল শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় নিহত শেখ সেলিমের নাতি দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জমিদার পরিবারের সন্তান জায়ান চৌধুরীর। প্রিয় নাতির সঙ্গে নিজেদের জমিদারির গৌরব ও আভিজাত্যের গল্প করতেন শিল্পপতি দাদা মতিনুল হক চৌধুরী। বাবার কাছ থেকে সুনামগঞ্জের হাওর নদী ও গ্রামের বর্ণনা শুনে গ্রামে আসতে আগ্রহ জন্মে জায়ানের। তাই দাদুর কাছে বায়না ধরে বাড়িতে নিয়ে আসতেই হবে।

নাতির হাত ধরে নিজেদের জমিদারির সীমানা ঘুরে ঘুরে দেখানোর ইচ্ছেও ছিল দাদুর। পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেবেন এমনটা ভাবছিলেন তিনি। তাই পারিবারিকভাবে নির্ধারিত হয় আগামী নভেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো নাতিকে সুনামগঞ্জে দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের ছায়াঘেরা বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। কিন্তু সেটা আর পূরণ হবে না কোনোদিন। গত রোববার শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমা হামলায় নিহত হন জায়ান চৌধুরী। তার বাবাও আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাতি প্রথমবারের মতো বাড়িতে আসবে এই আহ্লাদে বেজায় খুশি ছিলেন দাদা। তাই ঢাকা থেকে এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। এ সময় বাড়ির বনেদি পুরনো ভবনের সংস্কার কাজ শুরু করেছিলেন। সেই সুখস্মৃতি-আহ্লাদ এই পরিবারে এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। পুরো পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ। গ্রামের বাড়ির স্বজনরাও মর্মাহত।

স্বজনরা জানান, গত এক সপ্তাহ আগে ঢাকা থেকে মতিনুল হক চৌধুরী ওরফে পারুল চৌধুরী গ্রামের বাড়িতে ছুটে আসেন নাতির ইচ্ছা পূরণের জন্য। এসে পুরনো জমিদার বাড়ির সংস্কার কাজ করেন তিনি। শ্রমিক লাগিয়ে বাড়িঘর পরিষ্কার, বসতঘর সংস্কার, বিদ্যুৎলাইন সংস্কারসহ রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজও করিয়েছেন। বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল ফ্রিজ, জেনারেটরসহ নানা ধরনের মূল্যবান আসবাব সামগ্রী। এই কাজ নিয়েই বাড়িতে তিনি ব্যস্ত ছিলেন গত এক সপ্তাহ ধরে। কিন্তু আদরের নাতি বাড়ি আসার আগেই চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছে। তার বায়না আর কখনো পূরণ হবে না এটা মনে করে চোখের জল ফেলছেন দাদু। মতিনুল হক চৌধুরীর ছেলে মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন।

তারা জানান, নাতির আবদারে বাড়িতে এসে খোশ মেজাজে সংস্কার কাজ করছিলেন মতিনুল হক চৌধুরী। নাতি প্রথমবারের মতো নিজের পূর্বপুরুষের ভিটায় আসবে এতে খুবই আনন্দিত ছিলেন দাদা। নাতির নানা খুনসুঁটির গল্প করছিলেন বাড়ির স্বজনদের কাছে। নিজে উপস্থিত থেকে শ্রমিক লাগিয়ে তাদের সঙ্গে থেকে সংস্কার কাজও তদারকি করেছিলেন। গত রোববারও সংস্কার কাজ করছিলেন তিনি। বিকেলের দিকে তার কাছে ঢাকা থেকে ফোন আসে ছেলে প্রিন্স ও নাতি জায়ান শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে নিখোঁজ আছেন। এতে মুষড়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশে। সিলেটে স্বজনদের বাসায় অবস্থান করে সোমবার সকালে তিনি ঢাকায় চলে যান।

মতিন চৌধুরীর ভাতিজা সুজাত বখত চৌধুরী বলেন, পারুল চৌধুরী সম্পর্কে আমার চাচা হলেও আমরা সমবয়সী। তিনি ঢাকা থেকে আসার সময় আমাকে সিলেট থেকে নিয়ে এসেছেন। গল্প করেছেন তার নাতি ও আমার চাচাতো ভাই জায়ান চৌধুরী আগামী নভেম্বরে বাড়িতে আসবে। তাই তিনি পুরনো বাড়িঘর সংস্কার ও সাজাতে এসেছেন।

ভাটিপাড়া গ্রামের সংবাদকর্মী সৈয়দুর রহমান চৌধুরী বলেন, বাড়িতে এসে দাদা মতিনুল হক চৌধুরী খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। প্রথমবারের মতো নাতি বাড়িতে আসবে তাকে রাজকীয় বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। দামি ফার্নিচারসহ আসবাবপত্র আগ থেকেই বাড়িতে নিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এই দুর্ঘটনা তার মনে স্থায়ী ক্ষত রেখে গেছে। আমরা এলাকাবাসীও এই ঘটনায় মর্মাহত। আমরা এখন প্রার্থনা করছি জায়ানের বাবা প্রিন্স চৌধুরী যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।

মোসাইদ রাহাত/বিএ

টাইমলাইন  

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]