যে কারণে ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৫৬ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
শনিবার (৩ জানুয়ারি) কারাকাসে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর ভেনেজুয়েলার বৃহত্তম সামরিক কমপ্লেক্স ফুয়ের্তে তিউনাতে আগুনের ছবি/ এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে ও তাদেরকে ‘মার্কিন আইনে বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও গ্যাং সদস্য পাঠাচ্ছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের পর মার্কিন এই অভিযানের ঘটনা ঘটলো।

ঠিক কী কারণে এই অভিযান ও মাদুরোকে বন্দি করলো যুক্তরাষ্ট্র?

ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোকে দোষারোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে শত-সহস্র ভেনেজুয়েলান অভিবাসী প্রবেশের জন্য। ২০১৩ সাল থেকে প্রায় আট মিলিয়ন বা ৮০ লাখ ভেনেজুয়েলান অর্থনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়ন থেকে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মাদুরো ‘তার কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে’ বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন।

এদিকে, দ্বিতীবার ক্ষমতায় এসে মাদক প্রবাহ,বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেন,রোধে মনোযোগ দিয়েছেন ট্রাম্প। এরই অংশ হিসেবে তিনি দুটি ভেনেজুয়েলান অপরাধী গোষ্ঠী- ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’ ও ‘কার্টেল দে লস সোলেস’কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন ও অভিযোগ করেছেন যে দ্বিতীয়টি মাদুরোর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্টেল দে লস সোলেস কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যারা কোকেন পরিবহনে সহায়তা করেছেন।

অন্যদিকে, মাদুরো জোর দিয়ে বলেছেন যে তিনি কোনো কার্টেলের নেতা নন। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছেন, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ও ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করতে যুক্তরাষ্ট্র ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে।

ভেনেজুয়েলা কী পরিমাণ তেল রপ্তানি করে ও তা কেনে কারা?

মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করতে পারে। তিনি ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে এই দাবি করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে প্রথম তেলবাহী জাহাজ দখল করার পর এমন দাবি তোলেন মাদুরো।

সাংবাদিকরা যখন জাহাজ ও এর তেলের কী হবে জানতে চান, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, আমার ধারণা, আমরা তেল রেখে দেবো।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা পূর্বে অস্বীকার করেছেন যে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল দেশের অপ্রচলিত তেল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে ও তেল খাতের আয় সরকারি বাজেটের অর্ধেকের বেশি অর্থায়ন করে। তবে এর রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব ও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে।

মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ উৎপাদন করেছে। বর্তমানে দেশটি দৈনিক প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে ও এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো চীন।

পরিস্থিতি যেভাবে এই পর্যায়ে পৌঁছালো

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমেই ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার তথ্যের জন্য ঘোষিত পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে।

সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক বহনের অভিযোগে অভিযুক্ত নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করে। এরপর থেকে ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে এমন নৌযানের ওপর ৩০টির বেশি হামলা হয়েছে, যেখানে ১১০ জনের বেশি নিহত হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা একটি ‘অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতে’ জড়িত, যেখানে অভিযুক্ত মাদক পাচারকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনিয়মিত যুদ্ধ চালাচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলা ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর’ বিরুদ্ধে নয়।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চালানো প্রথম হামলাটি বিশেষভাবে সমালোচিত হয়েছে, কারণ সেখানে একবার নয়, দুইবার হামলা হয়েছিল। প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা দ্বিতীয় হামলায় নিহত হন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর বিবিসিকে বলেছেন, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানটি শান্তিকালে বেসামরিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলার মধ্যে পড়ে।

এর প্রতিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউজ বলেছে, তারা সশস্ত্র সংঘাতের আইন মেনে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে কার্টেল থেকে রক্ষা করতে, যারা আমাদের তীরে বিষ নিয়ে আসছে ও মার্কিনিদের জীবন ধ্বংস করছে।

অক্টোবরে ট্রাম্প বলেন, তিনি সিআইএকে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি স্থলভাগে হামলার হুমকিও দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, এমন প্রথম হামলা চালানো হয়েছে ২৪ ডিসেম্বর। যদিও তিনি ওই বিষয়ে খুব কম তথ্য দেন। তিনি শুধু বলেন এটি একটি ‘ডক এলাকা’ লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল, যেখানে নৌকায় মাদক বোঝাই করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, মাদুরো ‘যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু নয়’ ও তার জন্য ‘ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে’। তিনি সব নিষিদ্ধ তেলবাহী জাহাজের ওপর ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’ ঘোষণা করে মাদুরোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়ান। আর তেলই মাদুরো সরকারের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।