ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় মেক্সিকো কেন আতঙ্কিত?
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের ঘটনায় লাতিন আমেরিকাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দেশই আশঙ্কা করছে, ওয়াশিংটন হয়তো আবারও প্রকাশ্য সামরিক হস্তক্ষেপের পুরোনো পথে ফিরছে। এই উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী মেক্সিকোতে।
ভেনেজুয়েলায় গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোররাতে অভিযানের পর দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়ার নাম উল্লেখ করেন। ওই অভিযানে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তা ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, মাদকপাচার দমনের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর ভূখণ্ডেও সামরিক হামলা চালাতে পারে। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মেক্সিকোর বিষয়ে কিছু একটা করতেই হবে।’ একই সঙ্গে তিনি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি নাকি মাদক কার্টেলগুলোর কাছে ‘ভীত’ এবং ‘ওরাই মেক্সিকো চালাচ্ছে।’
‘আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম’
ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেন। সোমবার গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমরা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করি।’
আরও পড়ুন>>
ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের নজরে যে পাঁচ দেশ
মেক্সিকোতে সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ট্রাম্পকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট
তিনি আরও বলেন, ‘মেক্সিকোতে জনগণই ক্ষমতার উৎস। আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। সহযোগিতা হতে পারে, কিন্তু অধীনতা বা হস্তক্ষেপ নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সম্পর্ক
ইতিহাসগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মেক্সিকোর নেতাদের সবসময়ই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও নীতিতে সেই ভারসাম্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেক্সিকোর ইতিহাসের অধ্যাপক পাবলো পিকাতো আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাস মেক্সিকোর জাতীয় চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৮৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয় এবং বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও নিউ মেক্সিকোসহ বিশাল অঞ্চল অধিগ্রহণ করে।
এছাড়া মেক্সিকান বিপ্লবের সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশটির ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প সাম্প্রতিক বক্তব্যে মনরো নীতির কথাও উল্লেখ করেন। উনিশ শতকের সেই নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের প্রাধান্য দাবি করতো। তিনি একে ব্যঙ্গ করে ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের ছবি শেয়ার করে লেখে, ‘এটাই আমাদের গোলার্ধ।’
‘লাল রেখা’ স্পষ্ট
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিলেও শেইনবাউম অভিবাসন, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মতো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে মেক্সিকো সীমান্তে ১০ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করে। মাদকপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন রোধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও চলছে।
তবে শেইনবাউম স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মেক্সিকোর ভূখণ্ডে একতরফা মার্কিন সামরিক অভিযান হবে ‘লাল রেখা’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলায় হামলা ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকার মেক্সিকো কর্মসূচির পরিচালক স্টেফানি ব্রিউয়ার বলেন, শেইনবাউম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।
তার মতে, সেই একমাত্র লাল রেখা অতিক্রম করে সম্পর্ক ভাঙার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তবে ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে এখন আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএ/