যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ

আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা কি শেষ হয়ে গেলো?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:০৫ পিএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা আক্রমণে প্রশ্নবিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ/ গ্রাফিকস: জাগোনিউজ

গত শতাব্দীতে দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিনিষেধের একটি কাঠামো গড়ে তুলেছিল দেশগুলো। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে আর কোনো সর্বগ্রাসী সংঘাত ঠেকানো। তবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে সেই বিশ্বব্যবস্থা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ভেনেজুয়েলা থেকে তুলে আনা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সোমবার (৫ জানুয়ারি) নিউইয়র্কের যে আদালতে হাজির করা হয়, তার কাছেই অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তর। এ থেকেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার ভাঙনের আশঙ্কা। বিশ্লেষকদের মতে, ‘শক্তিই আইন’—এই নীতির প্রত্যাবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ ডিকার্লো বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা নির্ভর করে জাতিসংঘ সনদের সব বিধান মেনে চলার বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অটল অঙ্গীকারের ওপর।

আরও পড়ুন>>
ভেনেজুয়েলার পর ইরানে ‘কঠিন হামলার’ হুমকি ট্রাম্পের
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্পের হুমকি, ‘পতনের দ্বারপ্রান্তে’ কিউবা

মাদুরোকে বন্দি: যুক্তরাষ্ট্রের সাফাই গাইছে যেসব দেশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মাদুরোকে আটক করা পুরোপুরি আইনসম্মত। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, ভেনেজুয়েলা থেকে পরিচালিত মাদক চক্রগুলোকে ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের সঙ্গে একটি ‘সশস্ত্র সংঘাতে’ জড়িত।

কারাকাস থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনার পর তাদের বিরুদ্ধে ‘নার্কো-সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এই অভিযানকে ‘সুনির্দিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সামরিক অভিযান’ বলে দাবি করেছেন।

এই পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পশ্চিম গোলার্ধে ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের একটি মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মাদুরোকে আটক করার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও সামরিক হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। রোববার সন্ধ্যায় ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী কলম্বিয়া এবং দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া ‘একজন অসুস্থ মানুষ দিয়ে পরিচালিত, যে কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করে।’ গত অক্টোবরে ট্রাম্প প্রশাসন পেত্রো, তার পরিবার এবং সরকারের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক মাদক বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কলম্বিয়াকে বিশ্বের কোকেন বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

চীন থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকের মতে, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক আইনি শৃঙ্খলা আরও দুর্বল করবে।

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, মাদুরোকে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি—বলপ্রয়োগ না করার নীতির পরিপন্থি। তিনি সতর্ক করে বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের এ ধরনের আচরণ বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে।

ইউক্রেন, গ্রিনল্যান্ড ও তাইওয়ান ইস্যুতে প্রভাব

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপ এরই মধ্যে রাশিয়ার আগ্রাসনের চাপ সামলাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেছেন, মাদুরোকে আটক করার অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘আইনহীনতার যুগে প্রত্যাবর্তন’।

গ্রিনল্যান্ড নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। ট্রাম্প সম্প্রতি ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন পাল্টা বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ড সংযুক্ত করার কোনো অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

এদিকে, মাদুরোকে আটক করার ঘটনা চীনের পক্ষ থেকে তাইওয়ান ইস্যুতে সম্ভাব্য নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং সরাসরি সামরিক অভিযানের পরিবর্তে ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানোর কৌশলই অনুসরণ করবে। চীন তাইওয়ানকে তার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে মনে করে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে প্রতিক্রিয়া

গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের সময়ও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ট্রাম্প এরই মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ২০২৫ সালের জুনে সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘অবৈধ হামলা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে। এক বিবৃতিতে ইইউ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতি অবশ্যই মানতে হবে। তবে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান মন্তব্য করেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনেক পরাশক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না—এটি বাস্তব সত্য।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে আটক করার ঘটনা শুধু লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেই নয়, বরং পুরো বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইন ও শৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সূত্র: এপি
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।