বাড়ছে পানি বাড়ছে ভয় : সরকারি উদ্যোগ জরুরি

ড. মিল্টন বিশ্বাস
ড. মিল্টন বিশ্বাস ড. মিল্টন বিশ্বাস , অধ্যাপক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ১৩ জুলাই ২০১৯

গতকাল ১২ জুলাই (২০১৯) গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ ও কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির কথা স্মরণে রেখে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তার সরকারের সক্ষমতার কথা তুলে ধরে বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আমরা অবহেলা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করি না। আমরা মানুষের সুখ দুঃখের সঙ্গী হয়ে, মানুষের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের কল্যাণে ও উন্নয়নে কাজ করা এই নীতি নিয়েই আমরা কাজ করি বলেই আজকে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

আমরা যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম। তিনি বলেন, এখন বৃষ্টি হচ্ছে, বন্যা হচ্ছে, কোথাও নদীভাঙন হতে পারে বা পাহাড়ে ধস নামতে পারে। আমরা কিন্তু প্রতিনিয়ত সারাদেশে কোথায় কী ঘটছে খবর নিচ্ছি এবং সেখানে যার যা দায়িত্ব সেটা দেয়া আছে। তারা সঙ্গে সঙ্গে যার যা দায়িত্ব সেটা পালন করে যাচ্ছে। এখনে এতটকু কোন শৈথিল্য নেই। কারণ তাদের সব কাজ আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ম্যাসেজ দিয়ে জানাতে হয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় বিএনপি সরকারে একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন বলেছেন, ৯১ এর ঘূর্ণিঝড়, তখনতো বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। তারা জানেই না এত বড় একটা ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, এত মানুষ মারা গেছে।

পার্লামেন্টে যখন আমি বললাম, এতবড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, এত মানুষ মারা গেছে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পার্লামেন্টে বলে দিল ‘যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মানুষ মরে নাই।’ তখন আমি জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম যে, ‘কত মানুষ মরলে আপনার তত মানুষ হবে বলেন’-এছাড়া বলার মতো কিছু ছিল না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবেও জনগণের পাশে থাকে। অতীতেও ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।’

প্রধানমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে আমরা লক্ষ্য করি- ‘বাড়ছে পানি বাড়ছে ভয়’ শীর্ষক সংবাদে ১৩ জুলাই(২০১৯) দৈনিক আমাদের সময়ে লিখেছে ১০ জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে যাচ্ছে। কারণ নদ-নদীগুলোর ৬২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে; এর মধ্যে ২৬টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভাঙন দেখা দিয়েছে মানিকগঞ্জ জামালপুর ও লালমনিরহাটে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ১১ জুলাই ছিল ১২টি, ১২ তারিখে দেশের ১৪টি পয়েন্টে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব পয়েন্টে পানির উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে, তাতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

উল্লেখ্য, দ্রুত সময়ের মধ্যে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার এবং নীলফামারী জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উজানে ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে যমুনা নদীতে পানি আরও বাড়বে। পাশাপাশি উজানে গঙ্গার পানি বাড়ায় বালাদেশে পদ্মা অববাহিকায় বন্যা দেখা দিতে পারে।

সংবাদপত্র সূত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ মানুষ এখন পানিবন্দি। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে দেশের ১০টি জেলার লাখ লাখ মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। গেল সপ্তাহের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সময় এসেছে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। আরো কয়েকদিন সারা দেশে ভারী বর্ষণ হলে এসব এলাকার নদ-নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে এসব এলাকায় স্থায়ী বন্যার আশঙ্কাও সঙ্গত কারণে অমূলক নয়। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করতে হবে। বন্যার দুর্যোগ মোকাবিলা করার ত্বরিৎ উদ্যোগ নেয়া দরকার।

দুই.

মনে রাখতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চিরচেনা বর্ষা আজ পাল্টে গেছে। এ কারণে বিরূপ পরিবেশে বর্ষা যেন আজ ম্রিয়মান। টানা বর্ষণে নগর জীবনে নেমে আসে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক আর গ্রামবাসী বন্যার শঙ্কায় কিংবা ভাঙনের দুঃশ্চিন্তায় দিন পার করে। অতীতে আষাঢ়ের বৃষ্টি আসত নতুনত্ব নিয়ে। চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের প্রখর তাপদাহ থেকে শীতলতা দিতে নিয়ে আসত শান্তির বরিষণ। হাজার বছর ধরে আষাঢ়ের বারিস্নাত হওয়ার রূপ বাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল। তুমুল বৃষ্টিধারা, নদীমাতৃক দেশের নদীর পূর্ণ যৌবন, নদ-নদীর ভাঙা-গড়া সবই বাংলাদেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। তবে আষাঢ়-শ্রাবণে মেঘ ও রৌদ্রের খেলা পাল্টে গেছে।

গবেষকরা বলে থাকেন গত ৫০ বছর সময়কালে বৃষ্টিপাত বেড়েছে প্রায় গড়ে ২৫০ মিলিমিটার। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব হিসেবে গণ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের আধিক্য, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন বর্ষায় মেঘ করা মানে যখন-তখন যেখানে-সেখানে বাজ পড়া।

গত একশত বছরের গড় তাপমাত্রা বিশ্লেষণে দেখা গেছে ০.৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। একুশ শতকের শেষ পর্যায়ে এই তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি থেকে ৫.৬ ডিগ্রিতে উন্নীত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ লোক বিপদের মধ্যে পতিত হবে। উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে। বিশেষ করে ঝুঁকির মধ্যে থাকবে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, অগ্রগামী ৫০ বছরে পানির উচ্চতা ৩ ফুট বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। আনুমানিক ৩ কোটি লোক গৃহহীন হয়ে পড়বে এবং ১৭ শতাংশ জমি পানিতে বিলীন হতে পারে।

‘ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর তথ্য মতে, ২০৩০ সালের পর নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে পানি স্বল্পতা দেখা দিতে পারে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ১০০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে উষ্ণায়নের ৫ টি দিক পরিলক্ষিত হয়। এগুলো হলো, বন্যা, মরুকরণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড় এবং কৃষিতে অনিশ্চয়তা।

এই দুর্যোগের ভেতর আছে ১২ টি দেশ যার অন্যতম হলো বাংলাদেশ। ১৯৬৮ সালে স্টকহোম সম্মেলনের মূলমন্ত্র ছিল বিশ্ব পরিবেশের নিরাপত্তা এবং ৫ জুন আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসের ঘোষণা। পরবর্তিতে ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে প্রথম ‘ধরিত্রী সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ১৯০ টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেয়। সম্মেলনে বনাঞ্চল-সংক্রান্ত নীতিমালাসহ আরো বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৩ সালে ‘কানকুন সম্মেলন’ হলো। প্রায় সবগুলো সম্মেলনেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে। ‘বন্যা’ সম্পর্কে নিতে বলা হয়েছে ‘ডেল্টা প্ল্যানে’র মতো ১০০ বছরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

লেখাবাহুল্য, বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৭ সালের সাইক্লোন সিডর এবং ২০০৮-এর নার্গিসে ক্ষয়ক্ষতির কথা এখনো আমাদের মনে আছে। এদেশ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কবলিত একটি নদীমাতৃক দেশ; সাম্প্রতিক বন্যা স্বাভাবিকও বটে। তবে যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা করা বাংলাদেশের বিশাল একটি সাফল্য। একটি পত্রিকা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাত দিয়ে লিখেছে যে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ১৫৮৪ সাল থেকে ১৯৬৯, এই ৩৮৫ বছরে অস্বাভাবিক ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ছিল ২৭টি। পক্ষান্তরে, ১৯৭০ থেকে ২০০৯, এই ৩৯ বছরে এর সংখ্যা ছিল ২৬টি।

বিগত ৫০ বছরে ১৫ টি ভয়াবহ সাইক্লোন আঘাত হানে যেগুলোর বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৪০-২২৫ কিমি/ঘঃ। এর মধ্যে ৪ টি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সেগুলো হল ১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ ও ২০০৯-এর সাইক্লোন। বারবার এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সহজাতভাবে যেমন মানুষের প্রস্তুতি ও ক্ষতি প্রশমনের সক্ষমতা বেড়েছে। তেমনই সরকার ও বিভিন্ন মানবতাবাদী উন্নয়ন সহযোগিদের ক্রমাগত সহযোগিতায় এই ঝুঁকি প্রশমনের সক্ষমতা একটি পদ্ধতিগত কৌশলে রূপলাভ করেছে। অবশ্য সাম্প্রতিক বন্যা দুর্গত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে সরকারি উদ্যোগের পাশে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তৎপর ও সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে। জনগণের দুর্ভোগের সময় জনপ্রতিনিধিরা পাশে থাকবে এটাই প্রত্যাশিত।

দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরি প্রয়োজন। প্রকৃতির কাছ থেকে যত বড় আঘাতই আসুক না কেন সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে। বন্যা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করা জরুরি। নদীর বাঁধপ্রকল্পগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়া দরকার। ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে ‘ডেল্টা প্ল্যান’-এর বাস্তবায়ন হলে সেই চুক্তি গুরুত্ব হারাবে। অবশ্য পরিবেশ রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ বাড়াতে হবে। গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এতটা ঝুঁকির মধ্যে থাকার পরও আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির হতাশাজনক চিত্রই ফুটে ওঠে।

বন্যার পূর্বাভাস পদ্ধতিতে বিশ্ব অনেকদূর এগিয়ে গেলেও সেক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হলেই কেবল আমরা তা জানতে পারি। বন্যার পূর্বাভাস আগে থেকে পাওয়া যায় না বলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেমন বাড়ে তেমনি বাড়ে প্রাণহানিও। দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতিহীনতা আমাদের সার্বিক অগ্রগতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। এজন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। নদী খনন কাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। নদীর ওপর বিভিন্ন প্রকার অবৈধ শিল্পকারখানা উচ্ছেদ করার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আন্তঃনদীর গতিপথ সচল রাখার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবীরা অবিলম্বে বন্যাদুর্গত বিপন্ন মানুষের সাহায্যার্থে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে বন্যার দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

এ কথা সত্য যে, বন্যার দুর্যোগজনিত ঝুঁকি প্রশমনে বাংলাদেশ বিশেষভাবে সক্ষমতা অর্জন করেছে মূলত নিজস্ব সম্পদ, উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায়। এই কাজে লোকালয়ভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগিদের পাশাপাশি লোকালয়ভিত্তিক সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জ্ঞান ও চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া এই উদ্যোগের বিরাট একটি সাফল্য।

তিন.

‘বন্যা’ এখন কড়া নাড়ছে দুয়ারে। লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং নীলফামারী ও পাহাড়ি জেলাগুলোর নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে তীর উপচে পানি ঢুকে গেছে লোকালয়ে। কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়াসহ ক্ষেত-খামার, পুকুর, ঘরবাড়িও তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। কোথাও বা পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। এদেশের বাস্তবতা হলো ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বন্যার কারণে বিপর্যয় হলে উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে দুর্গত মানুষকে আরো দুর্ভোগে পড়তে হয়। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন-সংক্রামক রোগ। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোয় এখন এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে। দুর্গত মানুষকে এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ত্রাণ তৎপরতার জন্য সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুসারে অবিলম্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে দুর্গত মানুষের পাশে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ বন্যা পরবর্তী উপদ্রুত অঞ্চলে সংক্রামক রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে থাকে। বন্যা মোকাবিলায় সংক্রামকসহ নানাবিধ জীবন নাশক রোগবালাইয়ের আক্রমণকে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। বন্যা-পরবর্তী নাজুক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ যে কোনো মুহূর্তে মানুষের জীবনকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। বন্যার পর পানি পান করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ভাল করে পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কাঁচা পানি বা সিদ্ধ না করে পানি পান করা যাবে না। ফলমূল, শাকসবজি খাওয়ার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাপক বন্যায় শাকসবজি, ফলমূল সহজেই নানাবিধ জীবাণু অথবা সংক্রামক ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে এবং হওয়াটাই এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক। শাক-সবজি বা ফলমূল খাওয়ার আগে ফুটন্ত পরিষ্কার পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে সিদ্ধ পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর ফলের ক্ষেত্রে ভাল করে চামড়া ছেড়ে তা খেতে হবে। শাকসবজি পুরোপুরি সিদ্ধ করে খাওয়া ভালো।

অন্যদিকে ভারতের বেশ কিছু স্থানে বন্যায় মৃতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। সেখানকার পরিস্থিতির অবনতি আমাদেরও উৎকণ্ঠিত করে। কারণ একই নদীর প্রবাহ রয়েছে উভয় দেশে। সীমান্তবর্তী প্রদেশের নদীগুলোতে পানির চাপ অব্যাহতভাবে বাড়ায় নতুনভাবে সতর্কবার্তা জারি করেছে রাজ্যগুলোর সরকার। চলছে উদ্ধার তৎপরতা। কয়েকটি জায়গায় খোলা হয়েছে বিপর্যয় মোকাবিলার অস্থায়ী ক্যাম্প। আমাদের মতোই কয়েক দিন ধরে চলা বিরামহীন বৃষ্টির কারণে সেখানে বন্যা দেখা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা বন্যা কবলিত হলে স্বাভাবিকভাবে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশ প্লাবিত হয়। বন্যা মোকাবিলায় এজন্য উভয় দেশের যৌথ উদ্যোগ দরকার। আশা করি নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি বর্তমান সরকার সেদিকেও মনোযোগ দিবে।

লেখক : অধ্যাপক এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

এইচআর/জেআইএম

এদেশের বাস্তবতা হলো ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বন্যার কারণে বিপর্যয় হলে উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে দুর্গত মানুষকে আরো দুর্ভোগে পড়তে হয়। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোয় এখন এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে। দুর্গত মানুষকে এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। ত্রাণ তৎপরতার জন্য সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ রয়েছে।

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :