বিপৎসীমার ওপরে পদ্মার পানি, ফরিদপুরের চার উপজেলা প্লাবিত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ১৯ জুলাই ২০১৯

পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরিদপুর সদরসহ জেলার চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রীরচর, নর্থচ্যানেল, আলীয়াবাদ, চরমাধবদিয়া ও ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। দুর্ভোগে পড়েছে এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ। প্রতি মিনিটে মিনিটে বাড়ছে পদ্মা নদীর পানি। পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বর্তমানে বিপৎসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় এই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি আরও ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শুক্রবার সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার (৯ দশমিক ১৯) ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রীরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান মিন্টু জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। নতুন করে পূর্বডাঙ্গী, মুন্সিডাঙ্গী ও ব্যাপারী ডাঙ্গীতে পানি ঢুকে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষেতের ফসল ও গবাদিপশু নিয়ে মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে।

সদর উপজেলার আলীয়াবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম ওমর ফারুক ডাবলু জানান, তার ইউনিয়নের পদ্মা নদী সংলগ্ন এলাকায় দ্রুত গতিতে পানি ঢুকে পড়ায় ইউনিয়নের সাদীপুর, গদাধরডাঙ্গী ও আলিয়াবাদ এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা সাইফুল আজম জানান, তার ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বাঘেরটিলার প্রধান সড়কটি পানির তোরে ভেসে যাওয়ায় ওই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে কয়েকশ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

foridpur04.jpg

সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম মজনু জানান, তার ইউনিয়নের দুর্গাপুর, জমাদ্দারডাঙ্গী ও বগেরটিলা এলাকায় পানি ঢুকে পরায় প্রায় ৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান মোস্তাক জানান, শুক্রবার তার ইউনিয়নে ৬ ইঞ্চি পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক শত বাড়িঘর। মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের কাইমদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী গ্রামে কালুর বাজার থেকে পান্নুর দোকান পর্যন্ত সোয়া কিলোমিটার দৈর্ঘের পাকা সড়কে এক কিলোমিটার অংশ তলিয়ে গেছে। এছাড়া মনসুরাবাদ এলাকায় মনসুরাবদ মোড় থেকে রিয়াজউদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত ইট বিছানো সড়কটির আধাকিলোমিটার তলিয়ে গেছে।

মোস্তাকুজ্জামান আরও জানান, হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউনিয়নের চর নটাখোলা, কবিরপুর, নর্থচ্যানেল ও ৪২৩৮ দাগ গ্রামের ৩৪০ একর আউশ ধান, পাট ও ভুট্টা পানিতে তলিয়ে গেছে। ইউনিয়নের কাইমুদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী, পরান বিশ্বাসের ডাঙ্গী, আয়জদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী ও শুকুর আলীর ডাঙ্গী গ্রামের সাড়ে তিনশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

foridpur04.jpg

সরেজমিনে ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের কাইমদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকার যোগযোগের একমাত্র কালুর বাজার থেকে পান্নুর দোকন পর্যন্ত সোয়া কিলোমিটার দৈর্ঘের পাকা সড়কে এক কিলোমিটার অংশ তলিয়ে গেছে। তার মধ্যে দিয়েই শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চলাচল করছে।

কাইমদ্দিন মাতুব্বরের ডাঙ্গী গ্রামের স্কুলছাত্রী আয়শা পারভীন বলেন, যেভাবে পদ্মার পানি বাড়ছে তাতে শনিবার থেকে স্কুলে যেতে পারবো কি-না বলতে পারছি না। পানিতে স্রোতেরও অনেক বেশি।

একই এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ মাজেদা বেগম (৫৩) বলেন, দুই-তিন দিন পানি বেড়ে যাওয়ায় ছোট ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। এখন যাদের নৌকা নাই তারা বাজারেও যেতে পারছে না।

এদিকে পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের ছবুল্যা শিকদার ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ভাঙনে হুমকীর মুখে রয়েছে। তীব্র ভাঙনে স্কুলটি থেকে মাত্র একশ মিটার উত্তর দিকের দুরত্বে অবস্থান করছে পদ্মা নদী। এছাড়া উপজেলা সদরের বালিয়া ডাঙ্গী ও ফাজেলখার ডাঙ্গী গ্রামের বেড়ি বাঁধ সড়কও ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, স্কুলটি রক্ষার জন্য আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আপাতত পদ্মা নদীর স্কুল পয়েন্টে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন প্রতিরোধ করা হচ্ছে। পরবর্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অপরদিকে আড়িয়াল খাঁ নদে তীব্র আকারে ভাঙন শুরু হয়েছে। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ইউনিয়নে আড়িখাল খাঁ নদে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন নদ তীরবর্তী গ্রামের শতাধিক পরিবার।

নদী শাসনে কর্তৃপক্ষের নদের কিছু সীমানায় ভাঙনরোধে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও অন্য সীমানা জুড়ে শুরু হয়েছে ভাঙন। ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ না নেয়া হলে ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম এ বর্ষায়ই নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

চরমানাইর ইউনিয়নের আমিরখার কান্দি, জাজিরাকান্দি, চরবন্দরখোলা ফাজিল মাদরাসা, কাজীকান্দি, আদেল উদ্দিন মোল্যারকান্দি গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত নদের ভাঙনে প্রায় দুই হাজার বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১১টি পরিবার বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। এছাড়াও গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে।

foridpur04.jpg

চরমানাইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী জানান, বর্ষার শুরুতেই নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ ও চরবন্দরখোলা মাদরাসা।

তিনি আরও জানান, ভাঙনে প্রায় দুই হাজার বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও প্রায় ১১টি পরিবার বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান জানান, পদ্মায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে সদরপুর উপজেলার ৪৫টি এবং ভাঙা উপজেলার ১৪টি পরিবার। যাদের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, তাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রোকসানা রহমান জানান, ফরিদপুর এখনও বন্যা কবলিত জেলায় পরিণত হয়নি। তবে পদ্মার পানি বাড়ায় এ জেলার চারটি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৫০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, দুর্গতদের সাহায্যের জন্য ফরিদপুর সদর ও সদরপুরে ১৫ মেট্রিক টন, চরভদ্রাসনে ১০ মেট্রিক টন এবং ভাঙ্গায় ২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ওই চার উপজেলার সকল সরকারি কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়াও সংশ্লিষ্ট স্কুল ও মাদরাসাগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মহা. এনামুল হক বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফরিদপুর জেলায় মোট ৯২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

বি কে সিকদার সজল/আরএআর/এমএস

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :