অভিযোগের তীর রাজউকের দিকেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৯

রাজধানীর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের ২৩ তলাবিশিষ্ট এফ আর টাওয়ার। অগ্নিকাণ্ডে এ ভবনে থাকা ২৫ জন নিহত (ফায়ার সার্ভিস বলেছে ১৯, তবে পুলিশ বলছে ২৫ জন) হন। আহত হন অন্তত ৭৩ জন। অনেকে বাঁচার জন্য ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন। ধোঁয়ায় আটকে থাকা মানুষটি বাঁচার জন্য শেষবারের মতো স্বজনদের কাছে মুঠোফোনে বার্তা পাঠান।

গতকাল এমন না হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সবার মনে প্রশ্ন জাগতে থাকে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হলো, ভবনটির অনুমোদিত নকশা ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়মের তথ্য। স্থানীয় বিভিন্ন ভবন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয় জাগো নিউজের। তারা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দিকেই অভিযোগের তীর ছুঁড়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ১৮তলা ভবন নির্মাণের জন্য এফ আর টাওয়ারের নকশা রাজউক থেকে অনুমোদন করা হলেও সেখানে পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয় ২৩তলা। যেখানে রাউজকের অনুমোদিত নকশা থেকে এ ভবনের নকশায় আরও অনেক বিচ্যুতি রয়েছে। এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজউকের কাছে আরেকটি নকশা পেশ করে, যার সঙ্গে রাজউকে সংরক্ষিত নকশার কোনো মিল নেই।

রাজউক সূত্র জানায়, ভবনটি ১৮তলা নির্মাণের জন্য প্ল্যান পাস হয় ১৯৯৬ সালে। কিন্ত ২০০৫ সালে এসে ভবন মালিক কর্তৃপক্ষ একটা কপি দাখিল করেন যে, ভবনটি ২৩ তলা হয়েছে। সেটাতে সন্দেহ হবার কারণে তদন্ত শুরু করে রাজউক। সেই তদন্তে দেখা যায়, যে কপি তারা দাখিল করেছেন সে সম্পর্কে রাজউকের রেজিস্ট্রারে কোনও তথ্য নেই। এ ব্যাপারে ২০০৭ সালে রাজউক একটি রিপোর্টও তৈরি করে। তবে ধারণা করা হচ্ছে- রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে পরে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

বনানীতে অবস্থিত অন্য একটি বাণিজ্যিক ভবনের মালিকদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাজধানীর বেশির ভাগ ভবন বিল্ডিং কোড মানে না। এর দায় রাজউকের, কারণ কিছু অসাধু কর্মকর্তা এসবের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন কূটকৌশল ব্যবহার করে ভবন মালিকরা নকশার সঙ্গে ভবনের মিল রাখেন না। শুনেছি এফ আর টাওয়ারটি ১৮ তলা নির্মাণের জন্য নকশা রাজউক অনুমোদন করলেও সেখানে পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয় ২৩ তলা। এটা তো আর এমনি এমনি হয়নি, নিশ্চই এর সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত আছেন। তাই অভিযোগের তীরটা রাজউকের দিকে গিয়েই ঠেকবে।

এদিকে শুক্রবার এফ আর টাওয়ার পরিদর্শনে যান গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, ভবনটিকে ১৯৯৬ সালে ১৮ তলা নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে তারা (মালিকরা) রাজউকে একটি নথি দাখিল করে ভবনটি ২৩ তলা করেন। কিন্তু তাদের সেই নথি অনুমোদনের পক্ষে কোনো দলিল রাজউকে ছিল না। কারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি রাজউকের লোকও হন, আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। এসব কারণে সেই সময়ের রাজউক চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

FR-tawar-2

তিনি বলেন, এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং গাফিলতির মাধ্যমে হওয়া একটি হত্যাকাণ্ড। এর জন্য যারাই দায়ী, তারা যত শক্তিশালী আর প্রভাবশালী হোক না কেন, আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজউকের চেয়াম্যান আবদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগুন লাগার পর আমরা যখন তথ্য ঘাঁটতে গেছি, তখন এটা (নকশার অনুমোদন না নেয়া) পেয়েছি। এফআর টাওয়ারের মালিকপক্ষ ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজউকের কাছে আরেকটি নকশা পেশ করে, যার সঙ্গে রাজউকে সংরক্ষিত নকশার কোনো মিল নেই।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ২০০৭ সালে রাজউক একটি রিপোর্টও তৈরি করে। ভবনটি নির্মাণের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের সবারই শাস্তি হওয়া উচিত।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, রাজধানীর ভবন মালিকদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনে তাদের ভবনের অনুমোদন, নকশা, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটির অনুমোদনের কাগজ জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছি। সেগুলো দেখে আমরা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেব। এ ছাড়া আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট ভবনেগুলোতে যাবেন, পরিস্থিতি দেখে প্রতিবেদন দেবেন আর সেই অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব।

তিনি বলেন, সব সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে এক সঙ্গে কাজ করতে চাই। এ ভবন ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে কীভাবে ২৩ তলা হলো সেগুলো আমরা দেখব। এ অনিয়ম মেনে নেয়া যায় না।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ওই ভবনের নবম তলায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভানো ও হতাহতদের উদ্ধারের কাজ করে। পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং পুলিশ, র‌্যাব, রেড ক্রিসেন্টসহ অন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা উদ্ধার কাজে সহায়তা করেন।

এএস/জেডএ/এমকেএইচ

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :