‘আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, ক্ষমা করে দিও বাবা’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নীলফামারী
প্রকাশিত: ০৯:২৫ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৯
স্বামীর সঙ্গে নিহত রুমকি আক্তার

‘চারিদিকে আগুন আর ধোঁয়া। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে বাবা। আমি আর হয়তো বাঁচবো না। তোমার জামাইকেও খুঁজে পাইনি। তার মোবাইলও বন্ধ। বাবা আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমি তোমাদের কাছে কোনো ভুল করে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আমার জন্য তোমরা সকলেই দোয়া করো।’

রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনে আটকে পড়ার পর রুমকি আক্তার (৩০) তার বাবাকে মোবাইলে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন। তবে বাঁচতে পারেননি রুমকি, ওই ভবনেই মারা গেছেন। বনানীর ঘটনায় রুমকির স্বামী মাকসুদুর রহমান জেমি (৩২) আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হন।

নিহত রুমকি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের চেংমারী বিন্নাকুড়ি আদর্শপাড়া গ্রামের আশরাফ হোসেনের মেয়ে।

শুক্রবার দুপুর ১২টায় রুমকির মরদেহ নিয়ে আসা হয় জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের চেংমারী বিন্নাকুড়ি আদর্শপাড়া গ্রামে। এ সময় নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো নারী-পুরুষ ছুটে আসে মরদেহ দেখতে। বিকেল ৩টায় জানাজা শেষে মা রিনা বেগমের পাশে তাকে দাফন করা হয়। রুমকি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

রুমকি আক্তার জলঢাকা বিন্নাকুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, জলঢাকা রাবেয়া কলেজ থেকে এইচএসসি, রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ব্যবসায় অনার্স এবং ঢাকার তিতুমীর কলেজ হতে স্নাতকোত্তর সস্পন্ন করেন। ঢাকায় মাস্টার্সে পড়াকালীন হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি নেন রুমকি। একই এজেন্সিতে চাকরিরত ঢাকার গেন্ডারিয়া থানার আলমগঞ্জ ইউনিয়নের মৃত. মিজানুর রহমানের ছেলে মাকছুদার রহমানের (৩২) সঙ্গে তিন বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিয়ে হয়।

গত ১৭ মার্চ ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন রুমকি। গত চারদিন আগে ঢাকায় ফেরেন। বলে গিয়েছিলেন রোজার ঈদে আসবেন।

ব্যবসায়ী আশরাফ আলীর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে রুমকি আক্তার সবার ছোট ছিল। রুমকির চাচা আলহাজ সৈয়দ আলী জলঢাকা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। বড় ভাই রফিকুল ইসলাম রকি বাবার সঙ্গে ব্যবসা করেন। ছোট ভাই রওশন আলী রনি গ্রামের বিণ্যাকুড়ি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

রওশন আলী রনি জানান, মাস্টার্সে পড়াকালীন ওই ট্রাভেলস কোম্পানিতে চাকরি নেন রুমকি। তিনি কোম্পানির মতিঝিল প্রধান অফিসে কাজ করতেন। তবে ৩/৪ দিন আগে মতিঝিলের অফিস মেরামত কাজ চলায় তাকে বনানী অফিসে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে স্বামী মকছুদারসহ চাকরি করছিলেন। আগুনের ঘটনায় তারা দুইজনই মারা গেছেন।

নিহত রুমকির চাচা জলঢাকা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী বলেন, ৫ মাস আগে মারা যান রুমকির মা রিনা বেগম। আজ আমরা হারালাম মেয়ে এবং জামাই।

রুমকির বাবা আশরাফ হোসেন বলেন, তিন বছরের সংসারে প্রথমবারের মতো আমার মেয়ে রুমকি সন্তান সম্ভবা ছিল। ভেবেছিলাম নাতনি আসছে। নাতনিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। ৫ মাস আগে রুমকির মাকে হারিয়েছি। আজ মেয়েকেও হারালাম। এক নিমিষেই আমার সব শেষ হয়ে গেল। আজ বাবা হয়ে মেয়ের মরদেহ আমাকে ঢাকা থেকে গ্রামে বহন করে নিয়ে আসতে হলো। বুকটা যেন ভেঙে যাচ্ছে- আল্লাহ ওদের জান্নাতবাসী করুক।

জাহেদুল ইসলাম/আরএআর/এমকেএইচ

টাইমলাইন  

আপনার মতামত লিখুন :