কাশ্মীরের স্বাধীকারের লড়াইকে ‘জঙ্গি’ তকমায় দমিয়ে রাখা যাবে কী?

সাইফুজ্জামান সুমন
সাইফুজ্জামান সুমন সাইফুজ্জামান সুমন , সহ-সম্পাদক, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৪০ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় গত বৃহস্পতিবার দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর গাড়িবহরে ২০০ কেজি বিস্ফোরক বোঝাই একটি চার চাকার গাড়ি ঢুকে পড়ে। ওই গাড়ি বিস্ফোরণে ৪০ জনেরও বেশি সেনা নিহত ও আরও অনেকে আহত হন।

পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী জয়েশ-ই-মোহাম্মদ (জেইএম) ওই হামলার দায় স্বীকার করে। ২০০২ সালে এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, কিন্তু কাশ্মীরে এই গোষ্ঠীটির সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। পুলওয়ামায় হামলা চালানো আত্মঘাতী ২২ বছরের কাশ্মীরি ওই তরুণের নাম আদিল আহমেদ দার। গত বছরের গ্রীষ্মে হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় এই তরুণ।

১৯৮৯ সালে ভারত শাসনের বিরোধিতায় শুরু হওয়া জম্মু-কাশ্মীরিদের আন্দোলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলো হামলা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা ছিল এটি। অতীতে হামলায় এক সঙ্গে এতসংখ্যক ভারতীয় সেনার প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ভারত সরকার, দেশটির সব রাজনৈতিক দল, চলচ্চিত্র তারকা ও গণমাধ্যমও এক কাতারে এসে পাকিস্তান ও কাশ্মীরিদের নিন্দা জানাচ্ছেন। অনেকেই এই হামলার প্রতিশোধ নিতে দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

হামলাকারী ও তাদের সমর্থকদের সতর্ক করে দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, তাদের কড়া মূল্য দিতে হবে এবং তারা বড় ধরনের ভুল করে ফেলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে হামলার জবাব দেয়ার ধরন, স্থান এবং সময়ের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে...এটা ভারতীয় নতুন কৌশল।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রধামন্ত্রীর কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, হামলার প্রতিশোধ নিতে দেশের সব পক্ষই এক হবে। দেশটির কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী (সিআরপিএফ) এক টুইট বার্তায় বলেছে, আমরা ভুলে যাব না, আমরা ক্ষমা করব না। আমরা পুলওয়ামার শহীদদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি এবং শহীদ ভাইদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছি। ঘৃণ্য এই হামলার প্রতিশোধ নেয়া হবে।

ভারত শাসিত কাশ্মীরের আকাশে এখন স্লোগান ভাসছে, বিশ্বাসঘাতক কাশ্মীরিদের গুলি কর। ওই এলাকার স্থানীয় হিন্দুরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং তাদের গাড়ি-বাড়িতে আগুন দিচ্ছে। ভারতের অন্যান্য শহরেও কাশ্মীরি ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর সহিংস হামলা বেড়েছে। হামলার প্রতিশোধের এই ক্ষোভ এখন তুঙ্গে; যুদ্ধের দামামা বাজছে।

ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা চালানো তরুণ আদিল আহমেদ দার সবসময় লাজুক এবং নরম হৃদয়ের ছিলেন বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি মিলিশিয়া বাহিনী স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা একবার আদিলকে হেনস্তা করেছিল। তাকে আটকের পর নাকে খত দিয়েছিল এই বাহিনী।

আদিলের সহিংস হওয়া এবং প্রাণদানের পেছনে সামরিক বাহিনীর এই আচরণ দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন তারা। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এ ধরনের সহিংস আচরণের কারণে কাশ্মীরি অনেক তরুণ ভারত বিদ্বেষী হয়ে উঠছে। ভারতীয় বাহিনীর হাতে কাশ্মীরিদের এ ধরনের হেনস্তা অহরহ ঘটছে। সেখানে নারী-পুরুষ কোনো বাছ-বিচার করা হয় না। কাশ্মীরিদের শরীরে যেন সহিংসতার জীন রয়েছে; এমন চিন্তা-ভাবনা থেকে ঢালাও বিদ্বেষের মুখে পড়ছেন তারা।

গত চার বছর কাশ্মীরিদের জন্য ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর নতুন ধরনের ভারত গড়ার ডাক দিয়েছেন। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের কৌশল হলো ভারতের সঙ্গে একীভূত রাখতে কাশ্মীরি প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমানো। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। সেই সময় থেকে কাশ্মীরিদের ওপর ভারতীয় বাহিনীর নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং বাড়ছে।

ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে তরুণরা নিয়মিত হয়রানি শিকার এবং গ্রেফতার হচ্ছেন। দেশটির জননিরাপত্তা আইনের প্রয়োগকে অনৈতিক আইন বলে নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। কাশ্মীরের রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা হাজার হাজার। এদের মধ্যে অনেক কিশোর রয়েছে; যাদের আইনি সুরক্ষা নেই।

২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার ও বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে বড় ধরনের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে হেনস্তার শিকার হওয়ার পর কাশ্মীরের সশস্ত্র এই গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিলেন ওয়ানি-ও। তার মৃত্যুর পর কাশ্মীর কখনই শান্ত থাকেনি।

ভারত সরকার কাশ্মীরিদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বার বার দমন করেছে। কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি সামরিক বাহিনীর অবিচার ও নিরবচ্ছিন্ন কারফিউয়ের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৬ সালে কাশ্মীরে প্রায় ৭৫ জন নিহত ও আরও ১১ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো গ্রিলির অ্যান্থ্রপোলজি ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী আথার জিয়া কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরায় লেখা এক নিবন্ধে বলেছেন, কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ দমনের জন্য পেলেট গানের ব্যবহার তীব্র হয়েছে, যা বিশ্বে গণ-অন্ধত্ব বরণের কারণ হিসেবে পরিচিত। আহত এবং চোখের দৃষ্টি হারানো কাশ্মীরিদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে।

২০১৭ সালে কাশ্মীরি আন্দোলন দমাতে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে অপারেশন অল আউটের অনুমোদন দেয় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়। এর ফলে কাশ্মীরে সরকারি সৈন্য ও বেসামরিক হত্যা, ঘেরাও, তল্লাশি, কারাবন্দি ও সেন্সরশিপ বৃদ্ধি পায়। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা এবং পেলেট গানে অন্ধকরণকে জায়েজ করতে ভারত সরকার কাশ্মীরিদের আগ্রাসী সন্ত্রাসী ও ভূগর্ভস্থ শ্রমিকের তকমা লাগিয়ে দেয়। তবে গত এক দশকের মধ্যে কাশ্মীরের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় ছিল ২০১৮ সাল। গত বছর কাশ্মীরে অন্তত ১৬০ বেসামরিক নাগরিক, ২৬৭ যোদ্ধা ও ১৫৯ সেনা সদস্য নিহত হয়।

কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিবার ও ফৌজদারী আইনের তোয়াক্কাই করছে না ভারত সরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বারবার সমালোচনা করলেও ভারত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত বছরের জুনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার কার্যালয় কাশ্মীরের লাইন অব কন্ট্রোলের পাশের দুই দেশকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে এই প্রতিবেদনে কাশ্মীরে ভারতের নৃশংসতাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার বিদায়ী প্রধান জায়েদ রা'দ আল হুসেইন বলেন, ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের মঞ্চে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিনের; কিন্তু এই দ্বন্দ্বের অবসান হয় না। এটা এমন এক ধরনের দ্বন্দ্ব যা লাখ লাখ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার চুরি করেছে। এই দ্বন্দ্বের অপ্রকাশিত ভোগান্তি এখনও চলমান আছে।

ভারত জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনকে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রতিবেদন নিয়ে জবাবদিহীতা কিংবা কোনো ধরনের আলোচনা করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। কাশ্মীরে ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ ও ভারত সরকারের মানবাধিকার রক্ষার ব্যর্থতার মাঝেও স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোতে যোদ্ধা নিয়োগ আকাশচুম্বী। কাশ্মীরি শিক্ষিত তরুণ, যুবক যারা ভালো পেশার সঙ্গে জড়িত তাদের পাশাপাশি উচ্চ-মধ্য এমনকি নিম্নবিত্ত তরুণরাও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে যোগ দিচ্ছেন।

২০০০ থেকে ২০০৮ সালের মাঝে কাশ্মীরি আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধ-প্রতিবাদের ধরন বদলে গেছে। কখনো সশস্ত্র কখনো সরকারি অবাধ্যতা ঘোষণার মাধ্যমে। তবে এই আন্দোলন প্রাণঘাতী উপায়ে দমনের পথ কখনই পাল্টায়নি ভারত সরকার। কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত সরকারের প্রযুক্তিগত শাস্তিপ্রদানের নীতি পাল্টে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা করা হয়েছে। কাশ্মীরের রাজনৈতিক সংগঠন হুরিয়াত। ২৮টি দলের সমন্বয়ে গঠিত এই সংগঠন কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। যা কাশ্মীর প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখপত্র। তবে এই সংগঠনটিতে কাশ্মীরের শক্তিশালী সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি কম রয়েছে।

এমন সন্ধিক্ষণে পুলওয়ামা হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দার ঝড় শুরু হয়েছে। ভারতও সেই সুযোগে কাশ্মীরে নিষ্ঠুর সামরিক দলখদারী ও নিপীড়নকে আড়ালে রেখে কৌশলে সুবিধাজনক পোস্টারিং করছে। ক্ষুব্ধ কাশ্মীরিদের আরো ক্ষুব্ধ করা হচ্ছে। কাশ্মীরিদের আন্দোলন ‘তেহরিক’র (বিপ্লব) গায়ে একরঙা বাঁধাধরা ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদের’ রঙ ‘জঙ্গি’ তকমা পুনরায় লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের স্বাধীকারের এই আন্দোলনকে গৎবাঁধা জঙ্গি তকমা লাগিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে কী; সেই প্রশ্ন এখন অনেকের।

এটা দুঃখজনক যে, এ ধরনের বাঁধাধরা তকমা লাগানোর ঘটনায় এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে, যিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য সহানুভূতিপূর্ণ তদন্তের ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাবেন। প্রশ্নটি একেবারেই সাধারণ : কেন একজন কাশ্মীরি নিজেকে মানব বোমা বানাচ্ছেন?

১৯৪৭ সাল থেকে ভারত শাসন থেকে মুক্তি পেতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের লড়াই চালিয়ে আসছেন কাশ্মীরিরা। তাদের স্বাধিকারের এই লড়াইকে চাপিয়ে রাখার চেষ্টায় অনবরত মত্ত ভারত। ন্যায় বিচার এবং মুক্তির লড়াইয়ে বিদ্যমান কাঠামোর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন নিপীড়িত-ন্যায়বিচারবঞ্চিত কাশ্মীরিরা; যা এই বিশ্বকে দিতে হবে।

এসআইএস/জেআইএম

টাইমলাইন