আসছে ফণী, সাইক্লোন শেল্টারে যাচ্ছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল
প্রকাশিত: ০৬:০৬ পিএম, ০২ মে ২০১৯

প্রবল শক্তি সঞ্চয় করে অগ্রসর হতে থাকা ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। শুক্রবার ভারতের ওড়িশা হয়ে বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে ফণী। এ অবস্থায় ফণী আঘাত হানার আগেই বরিশালের নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষদের সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। এরই মধ্যে নিম্নাঞ্চলের মানুষদের সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।

ফণী মোকাবিলায় বরিশালে ২৩২ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে ১ লাখ ২৫ হাজার লোকের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় জরুরি বার্তা আদান-প্রদানের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। ৪০০ স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তু রাখা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে ৯৫টি মেডিকেল টিম। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও জেলার ২৮১ কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরতদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

এদিকে, পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বরিশালসহ দেশের সব নৌরুটে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে নদী বন্দরগুলোতে ১ নম্বর বিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে। যা পরে বাড়ানো হতে পারে বলে।

ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চারটি সভা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিভাগীয় কমিশনার রামচন্দ্র দাস। এতে জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান ছাড়াও উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সওজ, এলজিইডিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জানানো হয়, বরিশাল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অফিস-আদালত খোলা রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তাৎক্ষণিক সাহায্যের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৭ লাখ টাকা এবং দুই হাজার শুকনা খাবার প্যাকেট তৈরি রয়েছে। ফণী আঘাত হানলে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, ফণী মোকাবিলায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২৩২ আশ্রয়কেন্দ্র। যেখানে ১ লাখ ২৫ হাজার লোকের আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফণীতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০টি উপজেলার ইউএনওদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, যেহেতু আবহাওয়া বার্তায় জলোচ্ছ্বাস ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সেহেতু এমন দুর্যোগের পর বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। তাই পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও চাপকল নিরাপদে ঢেকে রাখার জন্য গ্রামপর্যায়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সভা থেকে প্রত্যেক উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সওজ, এলজিইডিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থাকে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

barishal

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল লতিফ জাগো নিউজকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী আগামীকাল শুক্রবার দেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষদের সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। দুর্যোগের সময় করণীয় বিষয়গুলো জানিয়ে মাইকিং করে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবিলায় জরুরি বার্তা-আদান প্রদানের জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, বরিশালের ১০টি উপজেলার ৮৫টি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ২৮১টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বরিশাল সদর হাসপাতাল ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পরিবহনের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

বরিশাল নৌ-নিরাপত্তা শাখার উপ-পরিচালক ও বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু বলেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে বরিশালসহ দেশের সব নৌরুটে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব নৌযানকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে মাইকিং করা হয়েছে। ফণী মোকাবিলায় কর্মকমর্তা-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ফণী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৯২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছে। পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত এই ঘূর্ণিঝড় আরও তীব্র হয়ে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শুক্রবার ভারতের ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এরপর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ৩ মে সন্ধ্যায় খুলনাসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে পৌঁছাতে পারে। তবে বর্তমান গতিপথ ঠিক থাকলে এ ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলে দেখা দিতে পারে শুক্রবার সকাল থেকে।

ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা এবং সংলগ্ন দ্বীপ ও চরগুলো ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

সাইফ আমীন/এএম/এমকেএইচ

টাইমলাইন