ফণীর আঘাতে লন্ডভন্ড পুরী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২২ পিএম, ০৩ মে ২০১৯

প্রবল বেগে বইছে হাওয়া, হাওয়ার দাপটে নুয়ে পড়ছে নারকেল গাছগুলো। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিবেগে ওড়িশা উপকূলে আছড়ে পড়েছে ‘শক্তিশালী প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’। ঝড়ে কাঁচাঘরসহ টিনশেডের আধাপাকা ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়ে ও অধিকাংশ ঘরের চাল উড়ে গেছে। পুরীতে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে।

ঐতিহাসিক তীর্থস্থান ও সৈকত শহরে অবস্থান করছেন ভারতের কলকাতা ২৪ এর প্রাক্তন চিত্র সাংবাদিক নারায়ণ চৌধুরীর। তিনি সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে এভাবেই জানান। আরও জানান, ‘ঝড়ে উড়ে যাওয়ার আগে অন্ধকার বাথরুমে ঢুকে বুঝেছি হোটেলের একটার পর একটা অংশ ভাঙছে।’
জানা গেছে, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকারে ঝড় এসে গ্রামে আঘাত হানে। ক্ষণিকের মধ্যে গ্রামের ঘরবাড়ি ও গাছপালা উপড়ে যায়। ঘরের চালগুলো বাতাসের তোড়ে উড়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হোটেলের বিরাট বিরাট কাঁচের জানালাগুলো ভেঙে পড়ছে। কিছু দূরেই উত্তাল সাগর। মনে হয় সেই সাগরেই তলিয়ে যাবে পুরো শহর। সকালেই গার্ড ওয়াল ভেঙে গেছে। পুরী অসহায়। আগেই বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে পুরো শহর।’

এ সাংবাদিক বলেন, ‘ক্যামেরার ফোকাস করতে পাচ্ছি না। ঝাপসা না স্পষ্ট কী ছবি উঠছে সেটা দেখারও সময় নেই। শুধু ক্লিক করে যাচ্ছি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফণী ঢুকে পড়েছে ওড়িশার অপর সৈকত শহর গোপালপুরে। এর প্রভাবে ১৭৫-১৮০ কিলোমিটার গতি নিয়ে পুরীর ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ঝড়।’

লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে শহরের জনজীবন। তবে আগে থেকেই নিরাপদ দূরত্বে সবাইকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবুও প্রবল ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

এর আগেই দিল্লির আবহাওয়া দফতরের ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের প্রধান মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে কোনও এক সময়ে ফণী আছড়ে পড়বে পুরী সংলগ্ন গোপালপুরে। এরপর সেটি পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে দক্ষিণবঙ্গের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের দিকে চলে যেতে পারে।

ফণীর যাত্রাপথ থেকে ১০ লাখ মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে ওড়িশা সরকার। বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ৪ হাজার ৮৫২ সাইক্লোন এবং বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। আপাতত, ওই ১০ লাখ মানুষের ঠাঁই হচ্ছে এই আশ্রয়কেন্দ্রই।

ফণী আঘাত হানার আগে থেকেই ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার-এর হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ বছরে এই অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড়ে পরিণত হয়েছে ফণী। এর আগে ১৯৯৯-এ এই মাত্রায় পৌঁছনো সুপার সাইক্লোনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিপুল।

প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, ফণী দিঘা উপকূল দিয়ে ঢুকে পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনা হয়ে বাংলাদেশের দিকে চলে যাবে। কিন্তু প্রভাব পড়বে এই গতিপথের দু’ধারের বিস্তীর্ণ এলাকায়।

সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির উপকূল এবং নিচু এলাকাগুলি থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি, বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার পাশপাশি এবং গাছ-বাড়ি ভেঙে পড়লে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো বাহিনী জেলায় জেলায় তৈরি রাখা হচ্ছে।

বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে দিঘা, বকখালি, মন্দারমণি ও সুন্দরবন এলাকায়। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর জলের পাউচ তৈরি করে রেখেছে। নবান্নে ১০০ জনের কুইক রেসপন্স টিম মজুত রাখা হচ্ছে।

সেচ দফতরের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করে বিভিন্ন বাঁধে নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি টেলিফোন সংস্থাগুলির মাধ্যমে উপকূল এলাকায় এসএমএস এলার্ট দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে ৪৫৪টি সাইক্লোন সেন্টারে উপকূল এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের রাখা হবে। ৬ মে যে সমস্ত এলাকায় নির্বাচন রয়েছে, সেখানে ব্যালট বাক্স এবং ভোটকর্মীদের ঠিক মতো পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে প্রশাসনকে।

নতুন নির্দেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য দফতরের সব কর্মীর ছুটিও বাতিল করা হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত জেলার র্যাপিড রেসপন্স টিমকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়তে পারে এমন এলাকায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজ, জেলা, মহকুমা এবং ব্লক স্তরের হাসপাতালে চিকিৎসকদের দল বিপর্যয় পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবিলায় তৈরি থাকবে।

আপদকালীন পরিস্থিতির জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও প্রস্তুত থাকবেন। স্বাস্থ্যভবনে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। বিদ্যুৎ ভবনের কন্ট্রোল রুমে অতিরিক্ত কর্মী রাখার পাশাপাশি জেলার অফিসগুলিকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত ছুটিও বাতিল হয়েছে কর্মীদের।

এমআরএম/এমকেএইচ

টাইমলাইন