ত্রয়োদশ সংসদে যাচ্ছেন বিএনপির যেসব প্রবীণ নেতা
দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক চড়াই–উতরাই, আন্দোলন ও সংগ্রামের পর চলতি মাসের ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশকিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত এ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন দেশের মানুষ।
এদিন সকাল সাড়ে ৭টায় দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয় এবং বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ।
ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় ভোট গণনা। গণনা শেষে বৃহস্পতিবার দিনগত রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন আসন থেকে বেসরকারিভাবে ফলাফল আসতে থাকে।
ফলাফল শেষে দেখা যায়, তরুণ প্রজন্মের নতুন মুখদের পাশাপাশি দেশের প্রবীণ রাজনীতিকদের ওপরও জনগণের আস্থা অটুট রয়েছে। বিএনপি থেকে বিজয়ী প্রবীণ রাজনীতিবিদরা আবারও প্রমাণ করেছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এখনো ভোটারদের আস্থার বড় জায়গা। বয়সের ভার নয়, বরং ত্যাগ, আন্দোলন ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাই তাদের রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি।
দেশের বিভিন্ন আসন থেকে বিএনপির একাধিক প্রবীণ নেতা বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদে ফিরছেন, যা দলটির রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের এ তালিকার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপির যেসব প্রবীণ নেতা। তারা হলেন—
আলতাফ হোসেন চৌধুরী (বয়স ৮২)
পটুয়াখালী-১ (সদর–দুমকি–মির্জাগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হন আলতাফ হোসেন চৌধুরী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ফিরোজ আলম পেয়েছেন ৫৮ হাজার ১৬১ ভোট।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বয়স ৮১)
ভোলা-৩ (লালমোহন–তজুমদ্দিন) আসনে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট পার্টির নিজামুল হক পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৩৫১ ভোট।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন (বয়স ৭৯)
কুমিল্লা-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪০ ভোট পেয়ে জয়ী হন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছেন ৯৪ হাজার ৮৪৫ ভোট।
ড. আবদুল মঈন খান (বয়স ৭৮)
নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে ৯২ হাজার ৭৩৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন ড. আবদুল মঈন খান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. আমজাদ হোসাইন পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৯২০ ভোট।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বয়স ৭৮)
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।
জয়নাল আবদিন (বয়স ৭৭)
ফেনী-২ (ফেনী সদর) আসনে ১ লাখ ৩১ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন জয়নাল আবদিন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৮ ভোট।
আবদুল আউয়াল মিন্টু (বয়স ৭৭)
ফেনী-৩ (সোনাগাজী–দাগনভূঞা) আসনে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪২৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ডা. ফখরুদ্দিন মানিক পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ১৬০ ভোট।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (বয়স ৭৫)
ঢাকা-৩ আসনে ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. শাহীনুর ইসলাম পেয়েছেন ৮২ হাজার ২৩২ ভোট।
মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ (বয়স ৭৫)
ঢাকা-৮ আসনে ৫৬ হাজার ৫৫২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে জয়ী হন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট। এই আসনের ১০৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৮টিতে সরাসরি ভোটগ্রহণ হয়।
এদিকে, সংসদের ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনের ফলাফল ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল পরে প্রকাশ করা হবে। এছাড়া জামায়াতের এক প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
আজ নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যা ২৯৭ আসনের প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত। অন্যদিকে, গণভোটে ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা ২৯৯ আসনের একীভূত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়েছে।
ইসি ঘোষিত ২৯৭ আসনের ফলাফলে দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিএনপি। দলটি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়ী হয়েছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা পেয়েছে ৬৮ আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি পেয়েছে ৬ আসন।
এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে দুটি আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন এবং খেলাফত মজলিস— প্রতিটি দল একটি করে আসন পেয়েছে।
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি।
এমডিএএ/এমএএইচ/