ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন

২০০৮ সালের পর প্রথম ‘বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক’ নির্বাচন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:০৭ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ব্রিফিংয়ে ইভার্স ইজাবস নির্বাচন নিয়ে মূল্যায়ন তুলে ধরেন, ছবি: জাগো নিউজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ২০০৮ সালের পর প্রথম ‘বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক’ নির্বাচন এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত বলে উল্লেখ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। তবে নারী প্রার্থীর স্বল্পতা, বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং কিছু প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটি ছিল সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক এবং নবায়ন করা আইনি কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে নির্বাচনটি অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং মৌলিক স্বাধীনতা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে কিছু রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অনলাইন বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসর তাদের অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করেছে।

ইভার্স ইজাবস জানান, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে এবং অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনি আইনি কাঠামো গণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনার জন্য উপযোগী হলেও আইনি নিশ্চয়তা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আরও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

কমিশন গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ বজায় রেখেছে, তবে কঠোর প্রচারণা বিধি সব ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় পক্ষপাতের অভিযোগও উঠেছে।

নির্বাচন প্রস্তুতি পেশাদারত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিদেশে থাকা প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নির্বাচনকর্মী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং সামগ্রী বিতরণও সুষ্ঠুভাবে হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধী ও সীমিত চলাচলক্ষম ভোটারদের জন্য সহজ প্রবেশযোগ্য ছিল না।

ভোট গণনা ও ফল সংকলন মোটামুটি দক্ষতার সঙ্গে হলেও কিছু ক্ষেত্রে অখণ্ডতা রক্ষার ব্যবস্থা পুরোপুরি অনুসরণ হয়নি এবং তিনটি ঘটনায় ফল সংকলনে স্বচ্ছতার ঘাটতি লক্ষ্য করা হয়েছে। তবুও দলীয় এজেন্টদের উপস্থিতি এবং নিয়মিত ফল প্রকাশ জনআস্থা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ৬০০-এর বেশি আপিল নিষ্পত্তি এবং দুই-তৃতীয়াংশ প্রার্থী পুনর্বহালকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তিনি বলেন, দুই হজারের এর বেশি প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ভোটাররা বিস্তৃত রাজনৈতিক বিকল্প পেয়েছেন। প্রচারণা ছিল প্রাণবন্ত এবং প্রার্থীরা সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, যদিও শেষদিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারস্পরিক অভিযোগ বেড়ে যায়।

নারীর অংশগ্রহণ কম হওয়াকে বড় হতাশা হিসেবে উল্লেখ করে ইভার্স ইজাবস বলেন, মাত্র ৪ শতাংশ প্রার্থী নারী ছিলেন। পিতৃতন্ত্র, বৈষম্য, অনলাইন হয়রানি ও চরিত্রহনন নারীদের অংশগ্রহণে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং জনপরিসরে ধর্মীয় বক্তব্যের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি জানান, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অন্তত ৫৬টি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে, যাতে শতাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে। নারী প্রচারকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও সম্পত্তিতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়।

অনলাইন প্রচারণায় বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণে।

ইভার্স ইজাবস জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অন্তত ৩০টি ভুয়া তথ্যের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে। জাতীয় ফ্যাক্ট-চেকিং উদ্যোগগুলো সক্রিয় থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতিক্রিয়া ধীর ছিল।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভারসাম্যপূর্ণ কাভারেজ ও বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যম সংস্কার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ এবং চাপের কারণে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের পরিসর সীমিত বলে উল্লেখ করা হয়।

নাগরিক সমাজের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ৮১টি নাগরিক পর্যবেক্ষক দল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তরুণ কর্মীরা দেশজুড়ে ভোটার শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে গণতান্ত্রিক চর্চায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

জেপিআই/এসএনআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।