বিজেপি জিতলে ভারতে বিভাজন আরও বাড়বে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৮ পিএম, ০১ মে ২০১৯

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। লিখছেন, গবেষণা করছেন বিশ্ব রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে। পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কায়।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর। ওই হামলার ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটা ধাঁধার অবতারণা করেন। বলেন, হামলা কারা এবং কেন করেছে, তা নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। আর জঙ্গি সংগঠন আইএসকে জড়িয়ে ওই হামলার যে দায় স্বীকার হচ্ছে, তা যথেষ্ট অনুমাননির্ভর।

আরও পড়ুন >> চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে মোদির সম্পদ বেড়েছে ৫২ শতাংশ

দীর্ঘ আলোচনায় গুরুত্ব পায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রসঙ্গও। ভারতের চলতি নির্বাচন নিয়ে মতামত জানিয়ে তিনি বলেন, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ওই দেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদের চরম বিকাশ ঘটছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব হওয়ার আহ্বান জানান এ বিশ্লেষক। চার পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে তৃতীয়টি।

জাগো নিউজ : ভারতের চলমান নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা বিশ্বে। এমন হিংসার নির্বাচন ভারতবাসীও আগে কখনও দেখেনি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতের কর্তৃত্বভাব প্রকাশ পাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে। আপনার বিশ্লেষণ কী?

ইমতিয়াজ আহমেদ : মোদি সরকার আসার পর ভারতের মধ্যকার বিভাজন তীব্র হয়েছে। এমন বিভাজন আগে কখনও ছিল না। এ নির্বাচনে যে পরিমাণ ঘৃণা ছড়িয়েছে, তা আগে কখনও হয়নি।

দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতা যেভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তাতে সবাই অবাক হয়েছে। ভারতে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি আগেও ছিল। কিন্তু এমন নগ্ন সাম্প্রদায়িকতা আগে কেউ দেখেনি। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য মোদি সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থাও তৈরি করল।

এ অবস্থা ভারতের জন্য শুভ সংবাদ নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটি কোনো রোল মডেল হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র আর রোল মডেল নেই। ট্রাম্প আসার পর মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়েছে গণতান্ত্রিক প্রশ্নে। ভারতেও তাই হতে যাচ্ছে।

বিজেপি ফের ক্ষমতায় আসলে ভারতে বিভাজন আরও বাড়বে।

জাগো নিউজ : কী হতে পারে ভারতের এবারের নির্বাচনের ফলাফল?

ইমতিয়াজ আহমেদ : বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করলে বিজেপির কোনোভাবেই ক্ষমতায় আসার কথা নয়। সম্প্রতি কয়েকটি রাজ্যসভার নির্বাচন থেকে তা-ই প্রমাণিত হয়েছে। দেশটির ৮০ বছরের ইতিহাসে এমন হারে বেকারত্ব বাড়েনি। আয় বৈষম্য চরমে। বিশ্বের ৩০টি দূষিত শহরের মধ্যে ২২টি-ই ভারতে। নারী নির্যাতন প্রশ্নেও ভারত এগিয়ে।

আরও পড়ুন >> প্রথম তিন দফার ভোটে বিজেপির ভরাডুবির আভাস

ভারতের বন্ধুরা গত পাঁচ বছরের নানা পরিসংখ্যান আমার কাছে পাঠিয়েছে। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোনোভাবেই বিজেপির ভালো করার কথা নয়।

কিন্তু নির্বাচনে জেতার কিছু কৌশল তৈরি হয়েছে বিশ্বে। নরেন্দ্র মোদি গতবার জনপ্রিয় ভোট পেয়েছিল ৩৬ শতাংশ। অথচ দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেল। হিলারি ক্লিনটন থেকে তিন মিলিয়ন ভোট কম পেয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলেন। তার মানে, কৌশলগত অবস্থান থেকেই এখন ক্ষমতায় আসা যায়। কোন জায়গায় কয়টি আসন পাওয়া যাবে তার কৌশল নির্ধারণ করতে পারলেই ক্ষমতায় আসা যায়। মোট ভোটের অনুপাত আর প্রয়োজন পড়ে না।

৩৬ শতাংশ ভোট পাওয়ার জন্য কী কী কৌশল নেয়া যেতে পারে নরেন্দ্র মোদি এখন তা-ই করছেন। এজন্য প্রধানতম অস্ত্র বানিয়েছেন উগ্র জাতীয়তাবাদ আর সাম্প্রদায়িকতা। ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও একই নীতি অবলম্বন করতে হচ্ছে। অন্য দেশের ক্ষমতাসীনরাও একই নীতি অবলম্বন করছেন।

ভারত এ নির্বাচনে কী পরিমাণ সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েছে, তার প্রমাণ হচ্ছে প্রজ্ঞা সাধীকে বিজেপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া। প্রজ্ঞা সাধীর বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন। সে চিহ্নিত সন্ত্রাসী। অথচ তাকেই প্রার্থী করা হলো। এটা কিন্তু বিজেপি বোকামির জায়গা থেকে করেনি। বিজেপি জানে ৩৬ শতাংশ ভোট পেতে হলে প্রজ্ঞা সাধীদের দরকার।

জাগো নিউজ : নির্বাচনে এই যে দ্বন্দ্বের প্রকাশ, এর মধ্য দিয়ে ভারত আসলে যাচ্ছে কোথায়?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এটা রীতিমতো ভাবনার ব্যাপার। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী জোটকেও জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে। সেখানে গণতন্ত্র হয়ে গেছে একেবারে নির্বাচনকেন্দ্রিক। একটি নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট পেলেই ক্ষমতায় যাওয়া যাবে এবং সেটাই হয়ে গেছে সেখানকার গণতন্ত্র। ভোট পাওয়ার জন্য সেক্যুলার দলগুলোও ডানপন্থী অবস্থান নিচ্ছে।

আরও পড়ুন >> ‘মুসলিমদের ধ্বংস করতে হলে বিজেপিকে ভোট দিন’

ফলে যে দলই বিজয়ী হোক না কেন, ঘৃণার রেশটা থেকেই যাবে। বিজেপি জিতলে সেখানে বিভাজন আরও মারাত্মক রূপ নেবে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। যদি না জেতে তবুও বিজেপির ভোটাররা বসে থাকবে না। তারা ভোটের ব্যাংক বাড়াতে হিংসার আগুন আরও ছড়িয়ে দেবে।

জাগো নিউজ : দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভারত ক্রমশই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে। এ নির্বাচনে দক্ষিণ এশিয়ায় কী প্রভাব ফেলবে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : ভারতে ডানপন্থীরা ভালো করলে অন্য দেশের ডানপন্থীরাও খুশি হবে। কারণ তারাও উগ্র রাজনীতি করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশেও তা-ই হবে। কারণ আমাদের এখানকার ডানপন্থীরাও বলতে চাইবেন, আমরাও ধর্মের রাজনীতির কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। হিন্দুত্ববাদের বিকাশ ঘটলে মুসলমানরা তো আর বসে থাকবে না। পাকিস্তানের সরকারপ্রধান ইমরান খানও বলেছেন, মোদি জিতলে তারাও খুশি। পাকিস্তানের আইএসআই, সেনাবাহিনী তখন ভারতবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ পাবে।

অথচ হিংসার এ রাজনীতি যে সবার জন্যই ক্ষতি বয়ে আনছে, তা হয়তো সবাই ভুলে গেছে।

জাগো নিউজ : তার মানে, আগামীদিনে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে হিংসাই মুখ্য হয়ে উঠবে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : আগামীদিনে কেন, এখনই তো রাজনীতিতে হিংসার ভরপুর। এ রাজনীতি আমরা একসময় ইউরোপে দেখেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নানা বিশ্ব সংস্থা গঠন করে হিংসা কমানোর চেষ্টা করা হলো। অথচ ইউরোপে ফের ডানপন্থীরা ক্ষমতায় আসছে।

আরও পড়ুন >> মোদিকেই ফের ক্ষমতায় দেখতে চান পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান

অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল থাকলে ডানপন্থীরা লাভবান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প এসেছেন দুর্বল অর্থনীতির ওপর ভর করে। সারাবিশ্বেই এখন অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল অবস্থানে আছে। ব্যতিক্রম শুধু চীন। চীন নিজে থেকেই উঠে আসছে। বিশ্বে তাদের কোনো খবরদারি নেই। এ কারণে পশ্চিমা বিশ্ব চীনকে নিয়ে চিন্তিত।

রাজনীতিকরা অনায়াসেই ভুলে যান যে, একটি ঘৃণা আরেকটি ঘৃণার জন্ম দেয়। মানুষ যত ভয় পায়, ততই অসহনীয় হয়ে ওঠে।

এএসএস/এমএআর/বিএ

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি আগেও ছিল। কিন্তু এমন নগ্ন সাম্প্রদায়িকতা আগে কেউ দেখেনি। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য মোদি সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থাও তৈরি করল

দেশটির ৮০ বছরের ইতিহাসে এমন হারে বেকারত্ব বাড়েনি। আয় বৈষম্য চরমে। বিশ্বের ৩০টি দূষিত শহরের মধ্যে ২২টি-ই ভারতে। নারী নির্যাতন প্রশ্নেও তারা এগিয়ে

কোন জায়গায় কয়টি আসন পাওয়া যাবে তার কৌশল নির্ধারণ করতে পারলেই ক্ষমতায় আসা যায়। মোট ভোটের অনুপাত আর প্রয়োজন পড়ে না

৩৬ শতাংশ ভোট পাওয়ার জন্য কী কী কৌশল নেয়া যেতে পারে নরেন্দ্র মোদি এখন তা-ই করছেন। এজন্য প্রধানতম অস্ত্র বানিয়েছেন উগ্র জাতীয়তাবাদ আর সাম্প্রদায়িকতা

রাজনীতিকরা অনায়াসেই ভুলে যান যে, একটি ঘৃণা আরেকটি ঘৃণার জন্ম দেয়। মানুষ যত ভয় পায়, ততই অসহনীয় হয়ে ওঠে

টাইমলাইন