বাম-মমতার পর এবার পশ্চিমবঙ্গ ‘হিন্দুত্ববাদী’ বিজেপির দখলে যাবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩৮ এএম, ২৪ মে ২০১৯

ভারতে এবারের লোকসভা নির্বাচনের প্রধান প্রশ্ন ছিল নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না! তারপরই যে প্রশ্ন নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, তা হলো বিজেপি কি পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের শক্ত দুর্গে ফাটল ধরাতে পারবে?

আজ ২৩শে মে এই দুই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছে ভারতবাসী। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভারতের ভাগ্য বিধাতা নির্বাচিত হয়েছে মোদির বিজেপি। মমতার দুর্গ দখল করতে না পারলেও বড় ফাটল ধরিয়েছে বিজেপির গেরুয়া বাহিনী।

এবারের নির্বাচনে মোদি এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর জনসভা করেছেন। ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী এই রাজ্যে, এমনকি বিধানসভা নির্বাচনের আগেও এতো জনসভা করেননি। প্রত্যেকটি জনসভায় মোদি মমতাকে ‌‘স্পিডব্রেকার দিদি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। বলেছেন, ‘আপনার জামানা শেষ হয়ে আসছে।’

কিন্তু সারা দেশে যখন মোদি সুনামি, পশ্চিমবঙ্গে মমতা যে ভাবেই হোক না কেন, নিজের জমি অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছেন। অর্ধেকের বেশি আসন এখনো তার দলের দখলে আছে। তাই সেই অর্থে উনি সত্যি ‘স্পিডব্রেকার।’

তবে মোদির বিরুদ্ধে মমতা যত উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন ‘৪২ এ ৪২’ অর্থাৎ রাজ্যের সবকটি লোকসভা আসনে তৃণমূলের জয় হবে, তা ফলাফলের পরে পরে শুনতে খুবই ঠুনকো লাগছে। মনে হচ্ছে, খানিকটা হলেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছিলো তৃণমূল কংগ্রেস। বলা বাহুল্য, বিজেপির অভাবনীয় সাফল্যের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য অপরিসীম।

ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হলেও ১৯৪৭ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কোনদিন মাটি পায়নি। হিন্দুসভার প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী একজন বাঙালি, কিন্তু তার দল অথবা পরে ভারতীয় জনসংঘ অথবা বিজেপি, কেউই পশ্চিমবঙ্গে কিছু করতে পারেনি।

প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭) তারপর সিপিএমএ’র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট (১৯৭৭ থেকে ২০১১), এরপর ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সবাই বলিষ্ঠভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করেছে। যার ফলে বিজেপি নেতাদের অনেকেই আজ মমতাকে তির্যক ভাষায় ‘মমতাজ বেগম’ বলে থাকেন।আর তার বিরুদ্ধে বারবার ওঠে মুসলিম তোষণের অভিযোগ।

বিজেপি এতগুলো লোকসভা আসন জিতে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার জন্য শুধুমাত্র জোরালো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে তাই নয়, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আবার ধর্মীয় রাজনীতির গেরুয়া পতাকার ছড়াছড়ি দেখা যাবে। এখানকার রাজনীতির ভাষায় ধর্মীয় প্রভাব দেখা যাবে। ধর্ম আর ঠাকুরঘরে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও ভারতের রাজনৈতিক নকশায় একটা ব্যতিক্রমী রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল। বামপন্থী আদর্শের পেছনে বাংলার একটা আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল। পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত হয়ে উঠেছিল ভারতের ‘লাল দুর্গ’ হিসেবে। অনেকে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টকে ‘বেঙ্গলি কমিউনিজম’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

তৃণমূল সেই দুর্গ গুড়িয়ে দিলেও বাংলা একটা আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখে তার আঞ্চলিকতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই আলাদা জায়গাটা খেয়ে দিয়েছে বিজেপি।

১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম বাংলায় কোনো জাতীয় দল এতটা জমি দখল করতে পেরেছে। আর তৃণমূল নেতা ও বর্ষীয়ান সম্পাদক চন্দন মিত্র তো আশঙ্কায় বলেই ফেললেন, ‘বিজেপি ইজ এ গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’ অর্থাৎ বিজেপি তো মনে হচ্ছে আগামী দিনে বাংলায় সরকার গড়তে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের মতে, ‘এটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটা বড় বিপর্যয়।’ তিনি বললেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দখলে যাওয়া মানে বাংলার ভাগ অবশেষে সবদিক থেকে পূর্ণ হওয়া।’

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ দখল মানে এই রাজ্য এখন ভারতের মূল স্রোতে। সব অর্থে না হলেও অনেক অর্থে। তার ভিন্ন আর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না। তবে তাতে অর্থনীতির কত লাভ হবে, সমাজ জীবনে কী পরিবর্তন হবে, এখনই তা বলা মুশকিল।

এবারের নির্বাচনে যেভাবে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ ঘটেছে, বুথে বুথে বোমা-বন্দুক চলেছে, যে ভাষায় মোদি আর মমতা একে অপরকে আক্রমণ করেছেন, বলাবাহুল্য তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংঘাত আরও বাড়বে।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বারবার বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসলে আসামের মতো করে পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিক পঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্টার ফর সিটিজেনস বা এনআরসি) করা হবে। যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা’ এবং তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া।

আসামে এ নিয়ে নাগরিক পঞ্জির খসড়ায় (ড্রাফট এনআরসি) প্রায় ৪০ লাখ বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের নাম বাদ পড়েছে, প্রায় ৪০ জন আত্মহত্যা করেছেন। মমতা প্রথম থেকে বলে আসছেন, তার রাজ্যে এনআরসি করতে দেয়া হবে না। এখন বিজেপি আর কেন্দ্রীয় সরকার তা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার দিকে এগোবে। এমনটা অনেকেই মনে করছেন।

তাতে রাজনৈতিক ছকও থাকবে। নাগরিক পঞ্জি থেকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে সংখ্যালঘুদের অনেককেই বাদ দিতে পারলে, আর তারপর কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণে নির্বাচন করলে, বিজেপির জয় নিশ্চিত বলে বিজেপি নেতাদের অনেকেরই ধারণা। অভিনেত্রী ও বিজেপি নেত্রী রূপা গাঙ্গুলী বলেন, এবার তৃণমূল মারামারি করতে না পারলে বিজেপি কম করে ৩০টি আসন পেত।

বিজেপির রাহুল সিনহা বলছেন, ছয় মাসের মধ্যে আমরা তৃণমূল সরকার ফেলতে পারব, ওদের অনেক নেতাকর্মী আমাদের দলে চলে আসবে । যেমনটা এসেছেন মমতার একদা সেনাপতি বলে পরিচিত মুকুল রায়।

এবার মূলত বামপন্থীদের ভোটের একটা বড় অংশ নিজেদের দিকে টানতে পারার জন্য বিজেপি এত ভালো ফল করেছে বলে মমতা ব্যানার্জী মনে করেন। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, ‘কমরেডরা এবার দলে দলে পদ্মফুলে ভোট দিয়েছে।’ বামফ্রন্ট যে একটি আসনও পাবে না সেই ইঙ্গিত তিনি দিয়ে রেখেছিলেন।

বিজেপি নেতা ও আইনজীবী সুনীল দেওধর অবশ্য বললেন, বাম শুধু নয়, তৃণমূলেরও একটি অংশ তাদের দিকে ঝুঁকেছে মমতার ‘অপশাসনের’ ফলে। আর আমরা মমতার কাছে অছ্যুৎ হলাম কবে, উনি তো এক সময় আমাদের সাথে ছিলেন।’ তৃণমূল ১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত বিজেপির জোটসঙ্গী ছিল, অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী ছিলেন মমতা।

বাম আমলের কলকাতার মেয়র এবং সিপিএম প্রার্থী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য বললেন, ‘আরে মমতার পিঠে চড়েই তো বিজেপি আমাদের রাজ্যে ঢুকলো, এখন আমাদের দোষ দিয়ে কী হবে।’

সূত্র : বিবিসি বাংলা

এসএ

টাইমলাইন