শিশুর সঙ্গে কাঁদছে বাবা-মা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:০০ পিএম, ২৯ জুলাই ২০১৯

রাজধানীতে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। এডিস মশার ছোবলে প্রতিদিন শিশুসহ কয়েকশ নারী-পুরুষ হাসপাতালে ছুটছেন। হাসপাতালের বেড অথবা ফ্লোরে শুয়ে চিকিৎসা নিলেও ডেঙ্গু মশার বিষের যন্ত্রণা থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলছে না। যন্ত্রণায় হাসপাতালেই কাতরাচ্ছেন কোমলমতি শিশুরা। আদরের সন্তানকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে কাঁদছেন বাবা-মাও।

রাজধানীতে মহামারি আকার ধারণ করা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১০ হাজারেও বেশি। দিন যত যাচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তত বাড়ছে। ফলে চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। এত রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ হাসপাতাল।

রোগীদের বেড দিতে পারছে না অধিকাংশ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাঁচার আশায় হাসপাতালের ফ্লোরে বিছানা পেতে অবস্থান নিচ্ছেন। ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে ফ্লোরে আবস্থান নেয়াদের মধ্যে যেমন বয়স্করা রয়েছেন, তেমনি রয়েছে শিশুরা।

রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু রোগীদের এই চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের অষ্টম তলার ফ্লোরেও ভর্তি রেখে চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হচ্ছে।

চিকিৎসা সুবিধা পেলেও ডেঙ্গুর যন্ত্রণায় হাসপাতালের ফ্লোরে শুয়ে কাতরাচ্ছে অনেক শিশু। কেউ কেউ বমিও করছে। যে শিশুটি কিছুদিন আগেও দুরন্তপনায় সারা ঘর মাতিয়ে রাখত, সেই এখন ব্যথায় কাঁতর। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাটছে দিন। দুরন্তপনায় মেতে ওঠা তো দূরের কথা মুখ দিয়ে ঠিকমতো কথাও বের হচ্ছে না। আদরের শিশুর এমন অবস্থায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না বাবা-মা।

সন্তানকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন ফাতেমা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বাবুর খুব জ্বর। তিন দিন ধরে এই হাসপাতালে আছি। জ্বর কমছে না। ব্যথায় বাবু ছটফট করছে। ছেলের এমন অবস্থা দেখে কোনো মা কি ঠিক থাকতে পারে? এতটুকু শরীরে ও এত যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করবে? ওর আব্বু তো ছেলের দিকে তাকাতেই পারে না। ছেলের মলিন মুখ দেখে নীরবে কাঁদে।’

Dengu-(2)

তিনি বলেন, ‘আল্লাহ্ যদি ওকে এই যন্ত্রণা না দিয়ে আমাদের দিত তাও সহ্য করা যেত। আমাদের একটাই সন্তান। রাতে ওর আব্বু, আমি কেউ ঘুমাতে পারি না। একটু চোখ বুজে আসলেই আবার ছটফট করে উঠে পড়ে। কবে যে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব? ছেলের এই যন্ত্রণা তো আর সহ্য করতে পারছি না।’

নারায়ণগঞ্জ থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে মুগদা হাসপাতালে আসা খায়রুল বলেন, ‘গত শুক্রবার বাবুর ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। এখন কিছুটা ভালো। কিন্তু গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা রয়েছে। বাবু এখনো ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ওর মা তো সারাদিনই ছেলের জন্য কান্নাকাটি করে। আমি সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মায়ের মন তো সহজে মানে না।’

তিনি বলেন, ‘জ্বরে পড়ার আগে আমাদের ছেলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সারাক্ষণ এ ঘর ও ঘরে ছুটে বেড়াত। এক মিনিটের জন্যও স্থির থাকত না। সারাক্ষণ ওর দুরন্তপনায় পুরো ঘর মেতে থাকত। সেই ছেলে এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে, এটা কে সহ্য করতে পারে বলেন?’

মশা নিধনে কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নন এই মা। অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এত কিছু করছি। দেশ ডিজিটাল হয়েছে। কিন্তু মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছি না-এটা কেমন কথা? প্রতিদিন হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সবারই আমার মতো অবস্থা। যার সন্তান অসুস্থ হয়, সে বোঝে কী জ্বালা! দোয়া করি আর কারও সন্তান যেন আমার সন্তানের মতো অবস্থায় না পড়ে।’

কোমলমতি শিশুদের যন্ত্রণায় বাবা-মার পাশাপাশি কষ্ট পাচ্ছেন নার্সরাও। হাসপাতালের অষ্টম তলায় দায়িত্ব পালন করা এক নার্স বলেন, ‘প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে। ডেঙ্গুর যন্ত্রণায় শিশুদের ছটফট দেখে আমাদের মনও কেঁদে উঠছে। বড়রাই ডেঙ্গুর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না, এত ছোট বাচ্চারা এই যন্ত্রণা কীভাবে সহ্য করবে?’

তিনি বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক থেকে সেবা দিচ্ছি ঠিক আছে, কিন্তু আমাদেরও তো মন আছে। মনের ভেতর যেমন ভয় আছে, তেমনি প্রতিনিয়ত চাপা কান্না রয়েছে।’

এমএএস/এসআর/এমকেএইচ

টাইমলাইন