এডিস মশারা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে, হাইকোর্টকে আইনজীবী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২১ পিএম, ২৫ জুলাই ২০১৯

ওষুধ ছিটানোর পরও কেন মশা মরছে না- হাইকোর্টের এমন প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেছেন, যে ওষুধ এখন ছিটানো হয় এটা অকার্যকর নয়; তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এখন এডিস মশারা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে। দিনে ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়ালে এই ওষুধেই মশারা মরবে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) হাইকোর্টের বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাইনুল হাসান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সায়েরা ফায়রোজ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে আইনজীবী তৌফিক এনাম টিপু। সকালে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এর আগে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মশা নিধনে ওষুধ আগেরবারের মতো এবার আর কাজ করছে না বলে হাইকোর্টকে জানান দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এরপর কী ধরনের ওষুধ ব্যবহার করলে মশা নিধনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে তা জানানোর জন্য দুই সিটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে আড়াই ঘণ্টা সময় দেন আদালত।

পরে বেলা আড়াইটার দিকে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা হাইকোর্টের শুনানির একপর্যায়ে বলেন, ‘রোববার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটালে সেই এলাকার মশা উড়ে সোমবার উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলে যায়।’ এ সময় হাইকোর্ট বলেন, ‘সদরঘাটে ওষুধ ছিটালে মশা উত্তরায় চলে যায়’ এটা কী ধরনের কথা!

এরপর আইনজীবী হাইকোর্টকে বলেন, ‘যে ওষুধ এখন ছিটানো হয় এটা অকার্যকর নয়; তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এখন এডিস মশারা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে। তাই দিনে ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়ালে এই ওষুধেই মশারা মরবে।’

আদালত তখন বলেন, ‘আগের বছর ওষুধ কাজ করলেও এখন কাজ করছে না কেন? আগে ওষুধ কীভাবে কাজ করত?’ আইনজীবী বলেন, গত বছর বা তার আগের পরিবেশ এ বছরের মতো নয়। কারণ এবার তীব্র গরম, অতিবৃষ্টি রয়েছে। তাই মশা বেশি। তিনি আরও বলেন, ওষুধ ছিটালে পরিবেশের ক্ষতি হয়। ড্রেনে থাকা ইঁদুর মরে যায়। বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় মারা যায়। এ সময় আদালত বলেন, ইঁদুর মারা গেলে কী হয়? মানুষের জীবন আগে, না কোনটা?

আইনজীবী বলেন, ‘দুই সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে ওষুধ ছিটানোর ডোজ আরও বাড়িয়ে একই দিন ওষুধ ছিটালে এই ওষুধেই কাজ হবে। ডোজ বাড়াতে হবে, কারণ মশারা এখন ফিবাইল, হারপিক ও বিটুমিনের পানি খেয়ে ফেলে। তাই আমরা ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়িয়ে দিনে তিন থেকে পাঁচবার ওষুধ দিয়ে দেখতে চাই। এতে মনে হয় কাজ হবে। কারণ এই একই ওষুধ ক্যান্টনমেন্টে কাজ করছে। ক্যান্টনমেন্টে কোনো মশা নেই।’

এ সময় আদালত দক্ষিণ সিটির আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনারা দিনে তিনবার ওষুধ ছিটান আর পাঁচবার ছিটান সেটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা চাই মশা মরুক।’

এরপর আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা আদালতকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিসসহ মশা নির্মূলে আগামী তিন-চারদিন দুই সিটিতে ছিটানোর মাত্রা (ডোজ) বাড়িয়ে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে দেখতে চাই। এতে মশা মরবে বলেই মনে করি।’

এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষের আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু আদালতকে বলেন, ‘নতুন ওষুধ আনা এখনই সম্ভব নয়। নতুন ওষুধ আনতে সর্বসাকুল্যে এক মাস সময় লাগবে। তাই আগামী কয়েক দিন আমরা কমবাইন্ডলি (সমন্বিত) অভিযান চালাই। সে সময়টুকু আমাদের দেন। আশা করি এতে কাজ হবে।’

এরপর আদালত মশা নিধনে দুই সিটির সমন্বিত অভিযানের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়ে এ বিষয়ে আগামী মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।

গত ২২ জুলাই মশা নির্মূলের কার্যক্রম জানতে দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন আদালত। সেই অনুযায়ী সিটির দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আদালতে হাজির হয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরীফ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এ সিটি কর্পোরেশনে এক কোটির বেশি লোক। আর ১০টি জোনে ৭৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল মাত্র ৪২৯ জন।’ তখন আদালত বলেন, ‘এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এত কেন?’

তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। ক্লাইমেট সেনসেটিভ ডিজিজ। এ বছর আমাদের দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ও সর্বোচ্চ উষ্ণতা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রভাব চলছে।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না কেন? গত বছর ওষুধ ছিটালে ঘরেও তার ঝাঁজ পেতাম। এবার গন্ধও পাওয়া যায় না। জনগণের ধারণা, এবারের ওষুধে কাজ হচ্ছে না।’

তখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যখনই ওষুধ আনি তখনই সরকারি দুটি ল্যাবে টেস্ট করে পজিটিভ সার্টিফিকেট পেলেই তা ব্যবহার করা হয়।’

আদালত বলেন, ‘যখন দেখলেন ওষুধ কাজ করছে না, তখন অন্য জায়গায় দ্রুত টেস্ট করলেন না কেন? এসব কি আমাদের বলে দিতে হবে? হোয়াট ইজ দ্য প্রবলেম? আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারাদেশের স্বাস্থ্য দেখবে। কারণ, যে অবস্থা হচ্ছে এটা কেবল সিটি কর্পোরেশনের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। বিষয়টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও দেখতে হবে।’

এরপর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন আদালতকে বলেন, ‘আমরা নতুন ওষুধ কেনব। এজন্য কারিগরি কমিটি করেছি। সমস্যা হচ্ছে, পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে করতে হয়। সেখানে অনেক সময় লাগে। তবে ডিপিএমের মাধ্যমে কিনলে তাড়াতাড়ি ওষুধ পেয়ে যাব।’

এরপর আদালত তার মৌখিক আদেশে নতুন ওষুধ আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে দুপুরের মধ্যে দুই সিটির আইনজীবীদের জানাতে বলেন।

গত ১৪ জুলাই এক আদেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের বাহক এডিস মশা নির্মূল ও ধ্বংসের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে পদক্ষেপ নিতে ডিএসসিসি ও ডিএসসিসিকে নির্দেশ দেয়া হয়। ২২ জুলাইয়ের মধ্যে এ বিষয়ে নেয়া পদক্ষেপ আদালতকে জানানোর নির্দেশও দেয়া হয়। সে অনুসারে ২২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু প্রতিবেদন দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আদালত। এরপর আজ দুই সিটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে হাইকোর্টে হাজির হতে নির্দেশ দেন আদালত।

এফএইচ/এসআর/এমকেএইচ

টাইমলাইন