কিট সংকটে পুরান ঢাকায় ডেঙ্গু টেস্ট বন্ধ

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ পিএম, ০২ আগস্ট ২০১৯

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা মনির হোসেন। তার পরিবারের দু’জন সদস্য জ্বরাক্রান্ত। ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে কি-না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারের সবাই। ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে আজ শুক্রবার দুই রোগীকে নিয়ে পুরান ঢাকার বেসরকারি ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়ঝাঁপ করেন। কিন্তু তিন প্রাইভেট হাসপাতালের কোথাও ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে পারেননি। তারা সকলেই জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে তাদের হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মনির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্যোগময় এ মুহূর্তে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কেন জ্বরের রোগীদের ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, ‘সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর যে পরিসংখ্যান দেয়া হচ্ছে বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার কথা বলা হলেও রোগীর চাপ অনেক, ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্ট করতে দেরি হবে-এমন অজুহাতে সুকৌশলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। ফলে আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা স্বজনকে বাঁচাতে বাধ্য হয়েই ছুটছেন প্রাইভেট হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে গিয়েও পরীক্ষা করাতে না পারায় অনেককেই ফেরত যেতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, এ মুহূর্তে সরকারের উচিত সকল বেসরকারি হাসপাতালকে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা এবং টেস্ট কিটস দ্রুত সরবরাহ করা। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলো যদি ডেঙ্গু রোগীদের হিসাব রেখে কতজনকে পরীক্ষা করল তার হিসাব সরকারকে জানায় এবং সরকার যদি এসব পরীক্ষার বিল পরিশোধ করে দেয় তাহলে জনমনে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে তা কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

তার কথার সূত্র ধরে এ প্রতিবেদক পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রফিকুল ইসলাম নামে এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে বলে স্বীকার করেন। বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুর পর্যন্ত তারা ডেঙ্গু টেস্ট করেছেন কিন্তু টেস্ট কিটস ফুরিয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে আপাতত বন্ধ রাখছেন। তিনি বলেন, আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন মাত্র ৪০ জন থেকে ৫০ জন জ্বরের রোগীর ডেঙ্গু টেস্ট হতো সেখানে গত কয়েকদিনে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগীর ডেঙ্গু টেস্ট করা হয়। এ কারণে মাত্র কয়েকদিনেই তাদের কাছে যতগুলো ডেঙ্গু টেস্ট কিট ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। ডেঙ্গু টেস্টের কিটস সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রায় অভিন্ন কথা বলেছেন মর্ডান ও ন্যাশনাল মেডিকেলের কর্মকর্তারা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তারের কাছে পুরান ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু টেস্ট বন্ধ রয়েছে- এমন তথ্য জানা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হঠাৎ করে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু টেস্ট কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ডেঙ্গু টেস্ট কিট আনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিপুলসংখ্যক ডেঙ্গু কিট আমদানি করা হয়েছে। আজকালের মধ্যেই সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু টেস্ট কিট পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন অন্যান্য রোগের চেয়ে ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর আনাগোনা বেশি। শয্যা সংকটের কারণে অসংখ্য জ্বরের রোগীকে ভর্তি না করে বাসায় রেখে চিকিৎসার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসকরা। চলতি আগস্টের মাত্র দুই দিনেই ৩ হাজার ৪০৫ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ২১ হাজার ২৩৫ জন রোগী। জানুয়ারিতে ৩৭, ফেব্রুয়ারিতে ১৯, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মেতে ১৯৩, জুনে ১৭৬৩, জুলাইয়ে ১৫৬১৪ ও আগস্ট মাসের দুইদিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৪০৫ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ভর্তি ১ হাজার ৬৮৭ রোগীর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২৩, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৩৫, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩৩, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১১৮, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ৩১, বারডেম হাসপাতালে ১৭, বিএসএমএমইউতে ২৯, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ১৯, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৪, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানায় ৫, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ৫৬ ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৯২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৭০ জন।

এদিকে, রাজধানীর বাইরেও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৯১ জন। ঢাকা বিভাগে ১৯০, চট্টগ্রাম বিভাগে ১১৯, খুলনা বিভাগে ৯১, রংপুর বিভাগে ৩৮, রাজশাহী বিভাগে ৮৭, বরিশাল বিভাগে ৭৭, সিলেট বিভাগে ১১ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন।

এমইউ/এসআর/এমকেএইচ

টাইমলাইন