মার্কিন নৌবাহিনী
আপাতত হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না
বর্তমানে হামলার ঝুঁকি খুব বেশি হওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কোনো জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না বলে জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। এরই মধ্যে তারা বেশ কয়েকটি জাহাজের নিয়মিত অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে জানা গেছে।
নৌবাহিনীর এই মূল্যায়ন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানিতে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি করছে। একই সঙ্গে এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্নতা তৈরি করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়মিত জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর এসকর্ট দিতে প্রস্তুত।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই সরু এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গত সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, প্রণালিটি এখন বন্ধ রয়েছে ও কোনো জাহাজ সেখানে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ইরান গুলি চালাবে। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এরই মধ্যে কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত শিপিং শিল্পের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে শিপিং ও তেল শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্রিফিং করছে। তবে এসব বৈঠকে তারা জানিয়েছে, আপাতত জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করানোর সক্ষমতা তাদের নেই।
পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রগুলো জানায়, এসব বৈঠকে শিপিং শিল্পের প্রতিনিধিরা প্রায় প্রতিদিনই নৌবাহিনীর কাছে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
সূত্রগুলোর একজন জানান, মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়েও নৌবাহিনীর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা বলেছে, হামলার ঝুঁকি কমে এলে তবেই এ ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য পেন্টাগনের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নৌবাহিনীর এসকর্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে পার করাতে প্রস্তুত।
সোমবার (৯ মার্চ) ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সময় এলে মার্কিন নৌবাহিনী ও তাদের অংশীদাররা প্রয়োজন হলে প্রণালি দিয়ে ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে। আশা করি এর প্রয়োজন হবে না, কিন্তু প্রয়োজন হলে আমরা সেগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করাব।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, নির্দেশ দেওয়া হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে পার করানোর সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পেন্টাগনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।
এক মার্কিন কর্মকর্তা ব্রিটশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দিয়ে পার করায়নি যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে একই দিনে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এক্সে একটি পোস্টে দাবি করেছিলেন যে নৌবাহিনী একটি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করিয়েছে। পরে তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে কিছু জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও অধিকাংশ জাহাজ চলাচল স্থগিত রয়েছে এবং শত শত জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবের আরামকো মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সতর্ক করে বলেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক তেলবাজারে ‘বিপর্যয়কর’ পরিণতি দেখা দিতে পারে।
সমুদ্র নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা হলেও প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। কারণ ইরান সহজে মাইন বসানো বা স্বল্পমূল্যের হামলাকারী ড্রোন ব্যবহার করতে পারে।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট ফর স্টাডিজ অন দ্য মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকার পরিচালক আদেল বাকাওয়ান বলেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কোনো আন্তর্জাতিক জোট বা অন্য কেউই বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে সক্ষম অবস্থানে নেই।
গত সপ্তাহে ইরান বিস্ফোরক বোঝাই একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত নৌকা ব্যবহার করে ইরাকের জলসীমায় নোঙর করা একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায় বলে ইরাকের দুই বন্দরের নিরাপত্তা সূত্রের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে।
এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছেন, প্রণালিটি পুরোপুরি নিরাপদ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হতে পারে। তিনি বলেন, এ ধরনের কাজের জন্য পর্যাপ্ত নৌযান নেই এবং এসকর্ট দেওয়া হলেও ঝুঁকি থেকে যায়। দ্রুতগামী নৌকা বা ড্রোনের বড় বহরের হামলায় এক বা দুটি জাহাজ সহজেই বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পেন্টাগন আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ইরানের মাইনবাহী নৌযান ও মাইন সংরক্ষণাগারে হামলা চালানো হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ