প্রেস টিভির কলাম
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দম্ভ গুঁড়িয়ে যেভাবে ‘পরাশক্তি’ হয়ে উঠলো ইরান
ইরানের ওপর অবৈধভাবে আরোপিত যুদ্ধের ৪০ দিন পার হতে না হতেই এক অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিনা আনুষ্ঠানিকতায় পিছু হটেছে, আর ইরান ঘোষণা দিয়েছে ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’। এর মাধ্যমে নিজেদের নতুন বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি তুললো তেহরান।
ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই প্রস্তাবে রয়েছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া। প্রস্তাবে আরও রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, যা এক মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে স্থবির করে রেখেছিল।
যে যুদ্ধ কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, তার ৪০ দিন পর আক্রমণকারীরা তাদের একটি লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি। ট্রাম্প নিজের তৈরি করা এই চোরাবালি থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়: এক অপরাজেয় জাতির কাছে একটি পরাশক্তির পরাজয়।
যুদ্ধের শুরু ও উদ্দেশ্য
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলাকালেই ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’।
প্রথম ধাপের হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয় ইসলামী বিপ্লবের নেতা আলী খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের। পরের হামলাগুলোতেও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিশানা করা হয়।
আরও পড়ুন>>
ইরান: বিশ্বের বুকে নতুন পরাশক্তির উত্থান?
হরমুজ প্রণালিতেই ডুবতে পারে মার্কিন ডলারের ‘দাদাগিরি’
‘ইসরায়েলের ইতিহাসে এমন কূটনৈতিক বিপর্যয় আর ঘটেনি’
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ধারণা করেছিল, এবার ইরানের পতন অনিবার্য। কিন্তু সেই হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।
ট্রাম্প আশা করেছিলেন ইরানের জনগণ তাদের সরকারকে উৎখাত করবে। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, ইরান আর ভেনেজুয়েলা এক নয়।
প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাত
ইরানের পাল্টা হামলায় যখন পুরো অঞ্চলের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হচ্ছিল, তখন ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ হয়ে গেছে। যুক্তি হিসেবে তিনি মোজতবা খামেনির নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তার এই দাবি হাস্যরসের জন্ম দেয়। একজন পর্যবেক্ষক টিপ্পনী কেটে বলেন, ‘আমেরিকা ইরানের বিপ্লবী স্লোগানগুলোই বদলাতে পারল না, শাসনব্যবস্থা তো দূরের কথা।’
১৩ মার্চ আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে কঠোর প্রতিরোধের শপথ নেন। তার নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী।
সামরিক ব্যর্থতা
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধবিমান হারায় বলে দাবি করা হচ্ছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ট্রাম্প একাধিক সময়সীমা বেঁধে দিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ এবং ইরানের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকট
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং কমে ৩৬ শতাংশে নেমে আসে এবং ৫৯ শতাংশ মানুষ তার কাজের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে। খোদ মার্কিন রাজনীতিবিদরাই এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের জন্য ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন। এমনকি তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোরও দাবি উঠেছে।
নতুন পরাশক্তির উত্থান
অবশেষে ৪০ দিন পর যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে রয়েছে: স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্বীকৃতি, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জাতিসংঘের সব নেতিবাচক প্রস্তাব বাতিল, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে লড়াই বন্ধ করা।
এটি কোনো ড্র বা অমীমাংসিত যুদ্ধ নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক, অনস্বীকার্য এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া পরাজয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ শেষ হয়েছে। আর এর মধ্যে দিয়ে ইরান একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সূত্র: প্রেস টিভি
কেএএ/