ইরান যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রে কি আবারও ফিরছে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০১ এএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের গুঞ্জন/ ফাইল ছবি: এক্স@SecWar

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন—সবখানেই এখন একটি প্রশ্ন ঘুরছে: যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ‘মিলিটারি ড্রাফট’ বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে? যদিও পেন্টাগন বা হোয়াইট হাউজ সরাসরি এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি, তবে প্রশাসনের কিছু অস্পষ্ট মন্তব্য এবং সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন এই জল্পনাকে উসকে দিয়েছে।

কী এই ‘মিলিটারি ড্রাফট’?

মিলিটারি ড্রাফট হলো এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সরকার দেশের নির্দিষ্ট বয়সের নাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সাল থেকে এটি বন্ধ রয়েছে এবং বর্তমানে দেশটিতে কেবল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী কাজ করছে। তবে আইন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী পুরুষদের ‘সিলেক্টিভ সার্ভিস’-এ নাম নিবন্ধন করে রাখতে হয়, যাতে জাতীয় জরুরি অবস্থায় সরকার তাদের তলব করতে পারে।

হোয়াইট হাউজের রহস্যময় অবস্থান

গত ৮ মার্চ ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে ড্রাফট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে এই সামরিক অভিযানের সাফল্য মূল্যায়ন করছেন। বর্তমানে এটি আমাদের পরিকল্পনায় নেই, তবে প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞতার সঙ্গে সব পথই খোলা রাখছেন।’

আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালালে ফলাফল কী হবে, ঝুঁকি কতটা?
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হওয়া বিপুল অর্থ দিয়ে কী কী করা যেতো?
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে কঠিন ৪ পথ, নেই সহজ সমাধান

এই ‘সব পথ খোলা রাখা’র মন্তব্যটিই জনমনে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের তুলনায় তিন গুণ বড় আয়তনের এবং দ্বিগুণ জনসংখ্যার দেশ ইরানে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ চালাতে হলে বর্তমান স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর বাইরে অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব ঘটনায় বাড়ছে সন্দেহ

ড্রাফট নিয়ে গুঞ্জন বাড়ার পেছনে বেশ কিছু সাম্প্রতিক পরিবর্তন কাজ করছে:

স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন: গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক আদেশে সিলেক্টিভ সার্ভিসে নাম নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করার বিলে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে ১৮ বছর হলেই যুবকদের নাম তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই একে ‘বাধ্যতামূলক নিয়োগের প্রথম ধাপ’ হিসেবে দেখছেন।

বয়স ও যোগ্যতার শর্ত শিথিল: গত ২০ মার্চ মার্কিন সেনাবাহিনী নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়স ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪২ বছর করেছে। এছাড়া আগে গাঁজা সেবন বা রাখার দায়ে অভিযুক্তদের নিয়োগ দেওয়া না হলেও, এখন সেই নিয়ম শিথিল করা হয়েছে।

যদিও মার্কিন সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ২০২৫ সালের নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পূরণ করেছে, তবুও সাম্প্রতিক শিথিলতাকে ‘সংকট’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

রাজনৈতিক বিতর্ক

ড্রাফট নিয়ে আলোচনা কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এক সাক্ষাৎকারে দেশপ্রেম ও সংহতি বাড়াতে ছয় মাস থেকে এক বছরের বাধ্যতামূলক সেবার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিনেতা রব স্নাইডারও ১৮ বছর বয়সীদের জন্য দুই বছরের সামরিক সেবার প্রস্তাব দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে এর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার ধারণাকে ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় তার প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না।

‘সেন্ড ব্যারন’ হ্যাশট্যাগ ও বিদ্রূপ

অনলাইনেও এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাউথ পার্কের লেখক টবি মর্টন ‘ড্রাফট ব্যারন ট্রাম্প ডটকম’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট খুলেছেন। সেখানে প্রেসিডেন্টের নিজের সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়া (হাড়ের সমস্যার অজুহাতে) এবং তার ছেলে ব্যারন ট্রাম্পকে নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ‘সেন্ড ব্যারন’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিংয়ে উঠে এসেছে, যেখানে সমালোচকরা বলছেন—অন্যের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠানোর আগে প্রেসিডেন্টের নিজের সন্তানদের পাঠানো উচিত।

সাবেক সিলেক্টিভ সার্ভিস ডিরেক্টর লরেন্স রোমো মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতে ড্রাফট ফিরিয়ে আনার সম্ভবনা প্রায় নেই বললেই চলে। দীর্ঘমেয়াদে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে সংকট দেখা দিলে বা বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে তবেই মিলিটারি ড্রাফটের মতো সিদ্ধান্ত বিবেচনায় আসতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।