দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ভয়ে ‘চুপ’ রয়েছেন মোদী
চলমান ইরান যুদ্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের মুখে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণের ভয়ে অনেকটা ‘চুপ’ থাকার কৌশল নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারতের কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, বিশ্বব্যবস্থায় শক্তিধর দেশগুলোই শেষ কথা বলে। আন্তর্জাতিক আইন বা চুক্তি অনেক সময়ই সেই শক্তির ব্যবহার ঠেকাতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ভারত পশ্চিমা মিত্রদের সমালোচনা করেছিল, যখন তারা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমালোচনা করছিল।
ভারতের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্পের নীতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্রই প্রকাশ করে—যেখানে স্বার্থই প্রধান।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধেও ভারতের অবস্থান
২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে আক্রমণ করে, তখনো ভারত মস্কোর বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেয়নি। দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা যুক্তি দিয়েছিলেন, বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তিধর দেশগুলো বরাবরই নির্মম আচরণ করে এবং তথাকথিত ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ অনেকটাই ভণ্ডামি।
আরও পড়ুন>>
ভারত দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলের পাশে আছে: মোদী
মোদীকে নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা নেতানিয়াহুর
‘ইসরায়েলি মডেলে’ কাশ্মীর চালাচ্ছে মোদীর ভারত
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এখনো একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। মার্চে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাইসিনা ডায়লগে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত পশ্চিমাদের জন্য এবং পশ্চিমাদের দিয়েই তৈরি।
তার মতে, এই ব্যবস্থা যদি এখন ভেঙে পড়ে, সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এতে ভারত ও গ্লোবাল সাউথের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Narendra Modi has been rather silent about the war in Iran. The explanation is fear of Donald Trump https://t.co/e6y6Wd9emj
— The Economist (@TheEconomist) March 13, 2026
দিল্লিতে উদ্বেগ
ভারতের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের অনেকেই এই আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং কাতারের মতো বড় সরবরাহকারী দেশ থেকে তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানি বন্ধ থাকে, তাহলে ভারতের জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।
মার্কিন সিদ্ধান্তে অসন্তোষ
রাইসিনা ডায়ালগ চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল ভারত সাময়িকভাবে কিনতে পারবে। কিন্তু এতে কৃতজ্ঞতার বদলে অনেক ভারতীয় নীতিনির্ধারকের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেন ভারতের হাতে ‘অনুমতির চিঠি’ ধরিয়ে দিয়েছে।
এই অস্বস্তি আরও বেড়ে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনের ক্ষেত্রে যে ভুল করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রেও সেই ভুল করবে না।
ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ
আরেকটি বিষয় নিয়ে দিল্লিতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায়, শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি এলাকায় একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে ট্রাম্প ওই হামলাকে ‘আরও মজার’ বলে মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন>>
‘ট্রাম্প ট্রমায়’ ভুগছেন নরেন্দ্র মোদী
স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি? ট্রাম্পকে বলেন মোদী
ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে গিয়ে নাচগান করেছিলেন মোদী
এই ঘটনার আগে ভারত একটি নৌ মহড়ায় ওই ইরানি জাহাজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ফলে ঘটনাটি ভারতের জন্য অপমানজনক বলেও মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
মোদী সরকারের নীরবতার কারণ
কূটনীতিকদের মতে, এসব ঘটনার পরও মোদী সরকারের নীরবতার প্রধান কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা।
২০২৫ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধে জড়ায়। এমনকি স্বল্পস্থায়ী ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনার সময়ও ওয়াশিংটন পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলক সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয়।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক উন্নত করার ট্রাম্পের আগ্রহ ভারতের কৌশলগত হিসাবকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
ভারসাম্য নীতির সীমাবদ্ধতা
ভারত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি তারা। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ এবং আফগানিস্তানে স্থলপথে প্রবেশের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দিল্লির অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ভারসাম্য নীতি ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করছে না। বরং দেশটি একই সঙ্গে বহু জায়গার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বড় ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য আরও নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৯৫ লাখ ভারতীয় কাজ করেন, যারা দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান।
যদি মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে চীন আরও বেশি রুশ তেল কিনতে পারে। এতে রাশিয়া চীনের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে সমস্যাজনক।
কারণ ভারত একদিকে রাশিয়ার অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও চীনের প্রভাব
জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে ভারত যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় পদক্ষেপ নেয়, তাহলেও নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কারণ বড় পরিসরে সোলার প্যানেল, উইন্ড টারবাইন এবং ব্যাটারি সরবরাহে সবচেয়ে সক্ষম দেশ হচ্ছে চীন। ফলে সেই ক্ষেত্রেও ভারতের নির্ভরতা বাড়তে পারে।
বিশৃঙ্খল বিশ্ব ভারতের জন্য ভালো নয়
সব মিলিয়ে, বিশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থা ভারতের জন্য মোটেও ভালো নয়। কারণ দেশটি নিজেকে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করছে।
তবে জাতীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রচারের কারণে ভারতের নেতারা প্রকাশ্যে এই উদ্বেগ স্বীকার করতে চান না।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/