নিষেধাজ্ঞা শিথিলে ইরানি তেল কিনতে আগ্রহী ভারতসহ এশিয়ার শোধনাগারগুলো
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান অস্থিরতার ফলে সৃষ্ট চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। আর এই তথ্য জানার পরপরই ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারগুলো আবারও ইরানি তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। শনিবার (২১ মার্চ) এমন তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ভারতের তিনটি শোধনাগার সূত্র জানিয়েছে, তারা ইরানি তেল কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা ও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অর্থপ্রদানের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্টতা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, এশিয়ার অন্যান্য দেশের শোধনাগারগুলোর মধ্যেও ইরানি তেল কেনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে এ বিষয়ে অবগত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
ভারত, যাদের অপরিশোধিত তেলের মজুদ অন্যান্য বড় এশীয় আমদানিকারক দেশের তুলনায় কম, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় দ্রুত রুশ তেল বুকিং শুরু করেছিল। তবে এ বিষয়ে অফিস সময়ের বাইরে ভারতের সরকারের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার (২০ মার্চ) ট্রাম্প প্রশাসন সমুদ্রে অবস্থানরত ইরানি তেল কেনার জন্য ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দেয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০ মার্চ বা তার আগে যেসব জাহাজে, এমনকি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ট্যাংকারেও তেল তোলা হয়েছে ও যা ১৯ এপ্রিলের মধ্যে খালাস করা হবে, সেই তেলের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য হবে। যুদ্ধ শুরুর পর এটি তৃতীয়বারের মতো তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করলো যুক্তরাষ্ট্র।
সমুদ্রে কোটি কোটি ব্যারেল তেল
কেপলারের অপরিশোধিত তেল বাজার তথ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ইমানুয়েল বেলোস্ট্রিনো জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে অবস্থান করছে। এসব তেলবাহী জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে চীনের উপকূলের কাছাকাছি পানিসীমা পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯ মার্চ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সমুদ্রে থাকা ইরানি তেলের পরিমাণ ১৩ থেকে ১৪ কোটি ব্যারেলের মধ্যে, যা মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান উৎপাদন ঘাটতির ১৪ দিনেরও কম সময়ের সমান।
এশিয়া তার মোট অপরিশোধিত তেলের ৬০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করে। তবে চলতি মাসে হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের শোধনাগারগুলো কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং জ্বালানি রপ্তানি কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
২০১৮ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকে চীন ইরানের প্রধান ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো দৈনিক প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে, যা নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্য দেশগুলো এড়িয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ছাড়ে পাওয়া যাচ্ছিল।
ক্রয়ে জটিলতা
তবে ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো—কীভাবে অর্থপ্রদান করা হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমুদ্রে থাকা তেলের একটি বড় অংশ পুরোনো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ জাহাজে বহন করা হচ্ছে।
এছাড়া, কিছু পূর্ববর্তী ক্রেতা জাতীয় ইরানি তেল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল বলে দুটি শোধনাগার সূত্র জানিয়েছে। তবে ২০১৮ সালের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে ইরানি তেলের বড় একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, “বিধিনিষেধ, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন বিষয় সামাল দিতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে যত দ্রুত সম্ভব সবাই এগোতে চাইবে।”
প্রতিষ্ঠানের নীতির কারণে এসব সূত্র নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
উল্লেখ্য, চীনের বাইরে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের আগে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে ছিল ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান ও তুরস্ক।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ