সস্তা ড্রোনে বদলে যাচ্ছে আকাশযুদ্ধ, চ্যালেঞ্জের মুখে ব্যয়বহুল অস্ত্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৪ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২৬
২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তেহরানে বার্ষিক সামরিক কুচকাওয়াজে ইরানের নতুন শাহেদ ১৩৬-বি ড্রোনের প্রদর্শন/ ফাইল ছবি: এএফপি

দশকের পর দশক ধরে আকাশে সামরিক আধিপত্য ছিল মূলত ধনী দেশগুলোর হাতে, যারা উন্নত যুদ্ধবিমান ও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম। তবে কার্যকরী হামলা করতে সক্ষম কিন্তু ‘সস্তা’ ড্রোন সেই আধিপত্যে ধীরে ধীরে ভাঙন ধরাচ্ছে এবং ছোট ও কম সমৃদ্ধ দেশগুলোকে আরও বেশি ক্ষতি করার সক্ষমতা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিশাল সামরিক বাজেটের ওপর নির্ভর করে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কিছু যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে আসছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে সব অস্ত্র মোতায়েন করেছে, সেগুলোর কিছু নিচে তুলে ধরা হলো।

মেঘের অনেক ওপরে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২০০টি ফাইটার জেট হামলা মিশনে পাঠিয়েছে। ব্যয় ও বিলম্বজনিত সমস্যার পর এবার প্রথমবারের মতো মার্কিন বাহিনী ব্যাপকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।

বি-২ বোমারু বিমান দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন, যা সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড নির্ভুলভাবে নির্দেশিত বোমা বহন করতে পারে।

বড় আকারের কিছু বিমান জ্বালানি সরবরাহ বা নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরেকটি বড় বিমান হলো বি-১ বোমারু, যার ডাকনাম ‘বোন’; এটি সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার পাউন্ড মিশ্র অস্ত্র বহন করতে পারে ও এতে ২৪টি পর্যন্ত ক্রুজ মিসাইল রাখা যায়।

মার্কিন মানববিহীন যানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রিপার’ ড্রোন, যা স্থলভিত্তিক স্টেশন থেকে পাইলট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে এফএলএম-১৩৬ লুকাস নামের একমুখী আক্রমণ ড্রোন, যা দেখতে ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতোই।

ইরান বহু বছর ধরে তাদের মিত্রদের কাছে মানববিহীন ড্রোন তৈরি ও সরবরাহ করে আসছে এবং এখন নিজেও ব্যাপকভাবে এগুলো ব্যবহার করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

এই কৌশলটি নির্ভুলতার চেয়ে সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ছুড়ে দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

অন্যদিকে, এই ড্রোনগুলো তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সস্তা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার।

সামরিক আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তা বোঝাতে রয়টার্স হিসাব করে দেখিয়েছে- মাত্র একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরির খরচ দিয়ে কতগুলো ড্রোন বানানো সম্ভব।

একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার বা ৪০ লাখ ডলার।

সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ও ধারণা করা হচ্ছে তারা প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধ প্রযুক্তিতে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে, যার স্পষ্ট উদাহরণ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। যেখানে শুরুতে ট্যাংক ও আর্টিলারির আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন এটি ক্রমশ ড্রোননির্ভর যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

প্রচলিত সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধবিমানে পিছিয়ে থাকা ইউক্রেন নজরদারি ও হামলার জন্য সস্তা মানববিহীন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। ধারণা করা হয়, রাশিয়ার মোট হতাহতের প্রায় ৭০ শতাংশই ড্রোন হামলার ফলে হয়েছে, যা দূর থেকে আঘাত হানার সুযোগ দেয় এবং পাইলটদের ঝুঁকি কমায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলো পরিচালনার জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে, দুই আসনের এফ-১৫ পরিচালনায় পাইলটদের দীর্ঘ সময় ধরে ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এসব বিমানের একটি ধ্বংস হলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিমানই নয়, তাতে থাকা প্রশিক্ষিত ক্রুকেও হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

অন্যদিকে, কম খরচের ড্রোন দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। ড্রোন ধ্বংস হলেও অপারেটর নিহত হন না ও নতুন ড্রোন তৈরির খরচ মাত্র কয়েক হাজার ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

এই অসমতা এখন একটি বড় কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আক্রমণের খরচ কমে গেছে, কিন্তু প্রতিরক্ষার ব্যয় আকাশছোঁয়া। অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কয়েক মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে এমন ড্রোন ভূপাতিত করতে, যা বাজারে সহজলভ্য যন্ত্রাংশ দিয়ে খুব কম খরচে তৈরি।

থাড বা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার একটি পূর্ণ ব্যাটারির খরচ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ইউনিটের দামও মিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

২০২৪ সালের মে মাসে পেন্টাগনের প্রধান অস্ত্র ক্রয় কর্মকর্তা বিল লাপ্লান্তে সিনেটের একটি উপকমিটিকে বলেন, আমরা যদি ৫০ হাজার ডলারের একটি একমুখী ড্রোন ভূপাতিত করতে ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করি, সেটি কোনো ভালো অর্থনৈতিক সমীকরণ নয়। তিনি সতর্ক করেন, আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

এই অসমতা এরই মধ্যে সমুদ্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে স্বল্পমূল্যের হুথি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন নৌবাহিনী প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি মূল্যের গোলাবারুদ ব্যয় করেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

ক্ষেপণাস্ত্রের দামই একমাত্র খরচ নয়। প্রতিটি প্রতিরোধে প্রয়োজন যুদ্ধজাহাজ, সঙ্গী জাহাজ, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল, গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থা এবং কমান্ড-নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক—যা হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয়।

লুকাস ড্রোন ব্যবহারে ইরানের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র এখন দ্রুত এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। ছোট সামরিক ড্রোন দ্রুত অনুমোদন দিতে ওয়াশিংটন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। ‘লো-কস্ট আনক্রুড কমব্যাট এরিয়াল সিস্টেমের (লুকাস)’ এর মতো প্রযুক্তি দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণত দীর্ঘ সময় নেয়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘মার্কিন সামরিক ড্রোন আধিপত্য উন্মোচন’ শীর্ষক নির্দেশনা জারি করেন। এতে পেন্টাগনকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ড্রোন মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি সতর্ক করেন, প্রতিপক্ষরা প্রতি বছর লাখ লাখ ড্রোন তৈরি করছে, অথচ পুরোনো ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়ছে।

লুকাস বনাম শাহেদ: পরিচিত নকশার পুনরাবৃত্তি

এফএলএম-১৩৬ লুকাস ড্রোনটি ইরানের শাহেদ ড্রোনের মতোই দেখতে, যা একমুখী আক্রমণ ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এটি মূলত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে, কিন্তু খরচ অনেক কম।

ড্রোনের বিস্তার ও কম খরচের কারণে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি হয়েছে, কারণ পাল্টা প্রযুক্তি এখনো পিছিয়ে।

ড্রোন প্রতিরোধে নতুন প্রযুক্তি

সস্তা ড্রোনের বিস্তার ঠেকাতে বিভিন্ন সামরিক বাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামার, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন এবং উচ্চশক্তির লেজারসহ নানা প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা আলোর গতিতে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।

এসব প্রযুক্তি বিদ্যুৎ বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিরক্ষার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বেশিরভাগ প্রযুক্তি এখনো সীমিত পরিসরে কার্যকর এবং পরীক্ষা পর্যায় থেকে পুরোপুরি বাস্তব ব্যবহারে আসেনি।

এই প্রযুক্তিগুলো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী এখনো জাহাজ, ঘাঁটি ও শহর রক্ষায় প্রচলিত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এখন বড় প্রশ্ন- ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি কি যথেষ্ট দ্রুত ও কম খরচে উন্নত করা সম্ভব হবে, নাকি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

সূত্র: রয়টার্স

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।