ট্রাম্প কি চাইলেই ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনতে পারবেন?
উত্তর আটলান্টিক জোট ন্যাটোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত সাম্যবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাকে সে সময় আক্রমণাত্মকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে বলে মনে করা হতো।
তবে এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিও কাজ করেছে। ১৯৩০-এর দশকে সমষ্টিগত নিরাপত্তার অভাবই নাৎসি জার্মানির নেতা অ্যাডলফ হিটলারকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চল দখল করছিল নাৎসি জার্মানি।
ন্যাটোর মূল নীতি কী?
ন্যাটোর মূল ভিত্তি হলো- সমষ্টিগত নিরাপত্তা, যা জোটের পঞ্চম অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সামরিক হামলা মানেই সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।
শীতল যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি কখনো সৃষ্টি হয়নি। কেবল একবারই এই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে আল-কায়েদার হামলার পর। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সামরিক অভিযানে সমর্থন দিতে জোটের সদস্যরা আফগানিস্তানে সেনা পাঠায়।
কেন ট্রাম্প জোট থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন?
বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ক্ষোভের কারণ হলো, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন বা সহায়তা দেয়নি। তবে ন্যাটোর সনদে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রান্ত হয়নি এবং আগেভাগে অন্যান্য ন্যাটো সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শও করেনি।
সম্প্রতি ট্রাম্প কী বলেছেন?
ট্রাম্প ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহার এখন ‘পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে’, যা থেকে বোঝা যায় তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন।
তিনি বারবার বলেছেন, ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমর্থনের অভাব এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইউরোপের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করবে না, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে রক্ষা করে। তবে আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধে ন্যাটোর সমর্থন এই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের গভীর ক্ষোভ আছে কি?
এমনটাই মনে করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে তিনি ন্যাটোকে ‘অচল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে যথেষ্ট অর্থ না দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকানোর’ অভিযোগ তোলেন।
২০২৪ সালে তিনি আরও বলেন, যেসব ইউরোপীয় দেশ তার নির্ধারিত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে ‘যা খুশি তাই করতে’ বলতে পারেন।
এছাড়া, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি দেওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতেও ন্যাটো সদস্যরা সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। পরে তিনি সরে এলেও অনেকেই মনে করেন, বিষয়টি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কোনো প্রভাব পড়েছে কি?
হ্যাঁ। ধারাবাহিক চাপের মুখে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করেছেন। গত জুনে ন্যাটো সদস্যরা ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে সম্মত হয়। এক দশক আগে অনেক দেশই ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করতে পারছিল না।
ন্যাটোর মহাসচিব ও নেদারল্যান্ডসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে ট্রাম্পকে খুশি রাখতে ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে জোটের ‘অভিভাবক’ বলেও উল্লেখ করেছেন ও ‘ট্রাম্প-ফিসফিসকারী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এমনকি, ন্যাটোর অ-যুক্তরাষ্ট্র সদস্যদের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইরান যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
ট্রাম্প কি ঠিক? ন্যাটো কি সত্যিই ‘কাগুজে বাঘ’?
ন্যাটোর সামরিক সহায়তা ইউক্রেনকে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে বড় ভূমিকা রেখেছে, যা এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। এটি ন্যাটোর প্রকৃত সদস্য দেশ পোল্যান্ড বা বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া ও এস্তোনিয়াকে রাশিয়ার হামলা বাঁচাতেও ভূমিকা রাখছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বহুবার বলেছেন, তিনি ন্যাটোকে ভেঙে দিতে বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা করতে চান। এতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অতীতে, ১৯৯৯ সালে ন্যাটো সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোশেভিচকে কসোভোয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বিরত রাখতে সামরিক পদক্ষেপ নেয়। মস্কো এটিকে তাদের প্রভাব বলয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল।
সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থায় ন্যাটো ‘কাগুজে বাঘ’ নয়। তবে ট্রাম্প যে এটিকে এভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে পুতিনের বক্তব্যকে সামনে আনেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ।
ন্যাটো মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্র কী দেয়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পারমাণবিক সুরক্ষা ছাতা। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তুলনায় অনেক বড়।
এছাড়া ইউরোপজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যার বেশিরভাগ জার্মানিতে। তুরস্কের ইনজিরলিক বিমানঘাঁটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এসব ঘাঁটি পশ্চিমা দেশগুলোর শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক।
ট্রাম্প কি সহজেই এই সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারবেন?
বিষয়টি জটিল। ২০২৪ সালে পাস হওয়া একটি আইনে বলা হয়েছে, সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করে নিতে পারবেন না।
তবে ট্রাম্প এর আগেও আইন পাশ কাটিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেমন- ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের বিধান অনুযায়ী কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানে হামলা চালানো।
এছাড়া সরাসরি জোট ছাড়াই তিনি অন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আইভো ডালডার বলেছেন, ট্রাম্প চাইলে ইউরোপ থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে পারেন ও কমান্ড কাঠামো থেকেও কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিতে পারেন। এতে তিনি পঞ্চম অনুচ্ছেদের শর্ত মেনে চলার দাবি করলেও বাস্তবে কোনো সামরিক সহায়তা দেবেন না।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ