দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধে উভয় সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্ররা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে এশীয় মিত্রদের ওপর সামরিক ও আর্থিক চাপ বাড়াতে শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সচল রাখতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ ও সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই আকস্মিক আহ্বানে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মিত্রদের প্রতি কড়া বার্তা
গত ১৪ মার্চ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্য মিত্র দেশগুলোরও সামরিক উপস্থিতি দেখতে চান।
এমনকি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চীনের সহায়তাও দাবি করেন। চীনের সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত একটি শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করে তিনি এখন পুরোপুরি ইরান যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, যা এশীয় মিত্রদের এক কঠিন উভয়সংকটে ফেলে দিয়েছে।
এশীয় দেশগুলোর উভয় সংকট
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো এখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এই দেশগুলো আশঙ্কা করছে, দূরের একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য না করলে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা সহায়তা কমে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আইনি জটিলতা: দক্ষিণ কোরিয়ার ‘চংহে’ অ্যান্টি-পাইরেসি ইউনিট বর্তমানে এডেন উপসাগরে রয়েছে। কিন্তু তাদের এই যুদ্ধে মোতায়েন করতে হলে সংসদীয় অনুমোদনের প্রয়োজন, যা সাধারণ জনগণের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে। কোরিয়ান কনফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে ‘আগ্রাসী যুদ্ধের সমর্থন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। একটি কোরীয় সংবাদপত্র শিরোনাম করেছে, ‘আগুন ট্রাম্প জ্বালালেও তা নেভানোর খরচ দক্ষিণ কোরিয়াকে দতে বলছেন’।
জাপানের সাংবিধানিক বাধা: জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে আগামী ১৯ মার্চ ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। যদিও জাপানের মাইনসুইপার জাহাজ পাঠানোর সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু দেশটির ‘শান্তিবাদী সংবিধান’ এবং ৭৫ শতাংশ জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব সানায়েকে কঠিন চাপে রেখেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সতর্কতা: অস্ট্রেলিয়া এরই মধ্যে কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাঠালেও তারা বিষয়টিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমর্থন’ না বলে ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের রক্ষা’ হিসেবে প্রচার করছে।
এশিয়া থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রত্যাহার
সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রয়োজনে এশিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জাপানে মোতায়েন করা মার্কিন মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এরই মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলো উত্তর কোরিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং এই ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘কঠোর বাস্তবতা হলো, আমরা সবসময় আমাদের মতো করে সব পাবো না।’
তাইওয়ানের নিরাপত্তা ঝুঁকি
এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাইওয়ান। ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যে ১০০টি উন্নত ‘পিএসি-৩ এমএসই’ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর পাওয়ার কথা ছিল, তা এখন অনিশ্চিত। কারণ, বর্তমানে এই উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সরবরাহ বিলম্বিত হলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা এবং জনবল—উভয়ই মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
‘প্ল্যান বি’র খোঁজে এশিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এসব এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ফলে এশীয় মিত্ররা এখন তাদের নিজস্ব ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেছে। মিত্ররা ভয় পাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের চোরাবালিতে যুক্তরাষ্ট্রে আটকে গেলে পরে এশিয়ায় কোনো সংকট তৈরি হলে তারা হয়তো আর পাশে থাকবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বলেন, ‘আমরা যদি অন্যদের ওপর নির্ভর করি, আর তারা না আসে—তাহলে কী করব, সেটাও ভাবতে হবে।’
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/