মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে এমআরআই স্ক্যানে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়ার ফলে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যাহত হয়েছে। হিলিয়াম চিকিৎসাক্ষেত্রে, যেমন এমআরআই স্ক্যান এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মতো উচ্চপ্রযুক্তিখাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূলত জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ এবং হিলিয়ামের প্রধান উৎপাদক কাতারের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে কত হিলিয়াম উৎপাদিত হয়?
২০২৫ সালে কাতার প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদন প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনমিটারের এক-তৃতীয়াংশ।
যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ বড় উৎপাদক নয়, তবে তারা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ।
২ মার্চ আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা করেন, প্রণালিটি বন্ধ এবং কোনো জাহাজ এটি অতিক্রমের চেষ্টা করলে আইআরজিসি ও নৌবাহিনী সেসব জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেবে। এরপর থেকে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ নয়—তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের সহযোগীদের জাহাজ ছাড়া। একইসঙ্গে নতুন নিয়ম আরোপ করা হয়েছে: যেকোনো জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের আগে তেহরানের অনুমোদন নিতে হবে। ফলে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের কয়েকটি জাহাজ ছাড়া প্রায় সব ধরনের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদক কাতারএনার্জি জানিয়েছে, তাদের তরল হিলিয়াম রপ্তানি বছরে ১৪ শতাংশ কমে যাবে।
কিভাবে এটি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়?
হিলিয়াম খুব কম ঘনত্বের গ্যাস হওয়ায় এটি তরল অবস্থায় ঠান্ডা করে বিশেষ কনটেইনারে সংরক্ষণ করা হয়, যা জায়গা বাঁচায় এবং খরচ কমায়।
তরল করার ৪৫ দিনের মধ্যে এটি পরিবহন করতে হয়, কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি গরম হয়ে আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।
কাতারে এই কনটেইনারগুলো সমুদ্রপথে রপ্তানি করা হয় এবং প্রায় সব রপ্তানি হরমুজ প্রণালি দিয়েই যায়।
কেন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে?
হিলিয়াম এলএনজি উৎপাদনের একটি উপ-পণ্য। তাই এলএনজি উৎপাদন কমলে হিলিয়ামও কমে যায়।
কাতারে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে এলএনজি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
২ মার্চ কাতারএনার্জি ঘোষণা করে, রাস লাফান ও মেসাইয়িদে তাদের স্থাপনায় হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। যদিও ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পরবর্তীতে রাস লাফান শিল্প এলাকায় হামলায় আগুন লাগে এবং কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মেরামতের কারণে বছরে ১২.৮ মিলিয়ন টন এলএনজি উৎপাদন ৩-৫ বছর বন্ধ থাকবে।
কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন কাতারের হিলিয়ামের প্রধান ক্রেতা। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ বাড়বে এবং দামও বাড়তে পারে।
হিলিয়াম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হিলিয়াম অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা যায়—শূন্য কেলভিনের কাছাকাছি। এটি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়, ফলে এটি অন্যান্য উপাদানকে দূষিত করে না।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত হয়, যা এমআরআই মেশিনের জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদন, বেলুন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও এয়ারশিপেও এটি ব্যবহৃত হয়।
হিলিয়াম না পেলে কী হবে?
হিলিয়ামের কোনো বিকল্প নেই, তাই এর ঘাটতি প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
২০০৬ সালের পর এটি পঞ্চম বড় বৈশ্বিক সংকট।
যদিও হিলিয়ামবিহীন এমআরআই প্রযুক্তি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে, এখনও অধিকাংশ মেশিন হিলিয়ামের ওপর নির্ভরশীল।
আর কে উৎপাদন করে?
যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় উৎপাদক, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি।
এক্সন মোবিল, নর্থ আমেরিকান হিলিয়ামসহ বিভিন্ন কোম্পানি উৎপাদন বাড়াতে পারে, তবে সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা কঠিন।
এদিকে, এয়ার লিকুইডসহ বড় কোম্পানিগুলো বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম