ইসলামাবাদ বৈঠকে কি শেষ হবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ৪৮ বছরের বৈরিতা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৫৩ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি রাস্তায় মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার খবর প্রদর্শনকারী একটি ডিজিটাল স্ক্রিন/ ছবি: এএফপি

ইরান একদিকে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অন্যদিকে। ৪০ দিনের তীব্র সামরিক সংঘাতের পর হঠাৎ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: এই পর্যায়ে যুদ্ধ থামাতে পক্ষগুলোকে ঠিক কোন সব কারণ বাধ্য করলো?

এই যুদ্ধবিরতি কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং সামরিক, কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা বাস্তবতার সমন্বয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর হিসাব-নিকাশ বদলে যাওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে। তবে এই সমঝোতা এখনো ভঙ্গুর ও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হতে পারে। এতে অংশ নিতে পারেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

যদি এই বৈঠক নিশ্চিত হয়, তবে ৪৮ বছরের মধ্যে এটিই হবে দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপ। সংলাপটি বোঝার সুযোগ তৈরি করে দেবে যে এই যুদ্ধবিরতি কি বাস্তব আলোচনার পথ খুলবে, নাকি কেবল সাময়িক বিরতি হিসেবেই থাকবে।

যুদ্ধবিরতি সম্ভব হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় ঘটনা ভূমিকা রেখেছে।

প্রথমত, ইরানের ৪০ দিনের প্রতিরোধ ও তাদের সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী জবাব, যাকে তেহরান ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সেই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কিছু মহলে প্রচলিত একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে যে, টানা সামরিক হামলায় ইরানের সরকার দ্রুত ভেঙে পড়বে।

দশকের পর দশক ধরে এই ধারণাই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যুদ্ধের ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব বদলে দিয়েছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ, যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল পরিবাহিত হয়।

সংঘাত চলাকালে এই নৌপথে বিঘ্নের আশঙ্কা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতেও পড়ে। ফলে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হয়, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে।

তৃতীয়ত, ১৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সামরিক অভিযানও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। লক্ষ্যটি ছিল ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম দখল করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন পাইলটকে উদ্ধারের আড়ালে এই অভিযান চালানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু পারমাণবিক উপাদানটি তারা দখল করতে পারেনি। এই ব্যর্থতা দেখিয়েছে, সামরিক উপায়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সংবেদনশীল অংশ দখল বা ধ্বংস করা কতটা কঠিন।

রাজনৈতিক বাস্তবতা

ইরানের ভেতরের পরিস্থিতিও সংঘাতের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে। কিছু পরিকল্পনাকারীর ধারণা ছিল, সামরিক চাপ জনঅসন্তোষ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বহু ইরানি জাতীয় ঐক্য ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পক্ষে রাস্তায় নেমেছেন।

বিদেশে থাকা অনেক ইরানিও যুদ্ধবিরোধী প্রচারণায় অংশ নেন। এতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সম্ভাবনার ধারণা জটিল হয়ে পড়ে।

সংঘাত চলাকালে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীও সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সুযোগ নিতে পারে- এমন আশঙ্কা থাকলেও ইরানি বাহিনী তা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের একাংশের মধ্যে বিরোধিতা বেড়েছে এবং রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনাও জোরালো হয়েছে।

এসবের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও জনমত যুদ্ধবিরোধী হয়ে উঠেছে। এছাড়া নভেম্বরের নির্বাচনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি

এই সংঘাতের বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধের ফলে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে ব্যাপক হামলা চালায়।

একটি মার্কিন পত্রিকা লিখেছে, এই যুদ্ধ ইরানকে একটি বড় বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করছে। সব পক্ষের সম্মিলিত ক্ষতি ও আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব অনিশ্চিত এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

প্রথমত, আলোচনার কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব, ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনা, নাকি উভয়ের সমন্বয়ে হবে, তা জানা যায়নি। এছাড়া ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অবস্থান পাকিস্তানের মধ্যস্থতার বিবরণের সঙ্গে মিলছে না, যা আলোচনার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

দ্বিতীয়ত, মূল প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই দুই সপ্তাহের বিরতি কি সত্যিই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, নাকি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আগে অস্ত্রভাণ্ডার পুনর্গঠনের সময়, তা অনিশ্চিত।

এই সন্দেহের পেছনে রয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা। ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া, ২০২৫ সালের হামলা ও আলোচনার মধ্যেই ২০২৬ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়া।

তৃতীয়ত, আগামী সপ্তাহগুলোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। পারমাণবিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে পূর্ণাঙ্গ সংলাপ একটি স্থায়ী সমঝোতার পথ খুলতে পারে। এক্ষেত্রে ইসরায়েলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে তারা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নের বিরোধিতা করেছে ও লেবাননে তাদের হামলা থেকেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সম্মান রক্ষার সমঝোতা প্রয়োজন

আঞ্চলিক জোটেও পরিবর্তন এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং যুদ্ধবিরতির পরদিনই তারা প্রকাশ্যে এই বিরতির বিরোধিতা করে।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, পাঁচটি উপসাগরীয় দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগিতা করেছে, যদিও কেউ তা প্রকাশ্যে অস্বীকার করেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, এসব দেশ কি ইরানের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়তে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত?

সবশেষে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির একটি অংশ যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। ফলে নেতাদের এমন একটি সমঝোতা দরকার, যা দেশের ভেতরে গ্রহণযোগ্য হবে।

কূটনৈতিক সফলতার জন্য সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ অপরিহার্য। ধাপে ধাপে আস্থা গড়ে তুলে পারমাণবিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।

বর্তমান আলোচনার সুযোগও বিশেষ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি ট্রাম্পের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আর ইরানের পক্ষে থাকছেন দেশটির স্পিকার গালিবাফ ও সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলঘার, যারা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। এই প্রতিনিধিত্ব উভয় পক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দিতে পারে।

সবশেষে, যেকোনো সমঝোতায় সব পক্ষের জন্য সম্মান রক্ষার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে প্রত্যেকেই তা নিজেদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। তাহলেই বর্তমান যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নিতে পারে, নাহলে এটি কেবল দীর্ঘ সংঘাতের আরেকটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই থেকে যাবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।