হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্বাভাবিক: রয়টার্সের প্রতিবেদন
মার্কিন অবরোধ কার্যকর হওয়ার প্রথম পূর্ণ দিনে ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। মঙ্গলবারের (১৪ এপ্রিল) তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ইরান-সংযুক্ত তিনটিসহ আটটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ ঘোষণা করেন, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সপ্তাহান্তের শান্তি আলোচনায় কোনো সমঝোতা না হওয়ার পর।
এই অবরোধ জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান, তেল কোম্পানি ও যুদ্ধঝুঁকি বীমা প্রদানকারীদের জন্য আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন যেখানে ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, এখন তা তার একটি ছোট অংশে নেমে এসেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজ মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করতে পারেনি। তারা আরও জানায়, ছয়টি জাহাজ মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনে ঘুরে ইরানের বন্দরে ফিরে গেছে।
ইরান-সংযুক্ত তিনটি জাহাজ প্রণালি পার হলেও সেগুলো ইরানের কোনো বন্দরের দিকে যাচ্ছিল না, ফলে অবরোধের প্রভাব পড়েনি।
পানামা পতাকাবাহী ‘পিস গালফ’ নামের একটি মাঝারি আকারের তেলবাহী জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরের দিকে যাচ্ছে বলে তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থার ডেটায় দেখা গেছে।
জাহাজটি সাধারণত ইরানের ন্যাফথা নামের পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে তা এশিয়ায় রপ্তানি করা হয়।
এর আগে দুটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজও এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করেছে।
‘মুরলিকিশান’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ১৬ এপ্রিল ইরাকে গিয়ে জ্বালানি তেল লোড করবে বলে তথ্য রয়েছে। ‘এমকেএ’ নামে পরিচিত এই জাহাজটি আগে রাশিয়া ও ইরানের তেল পরিবহন করেছে।
আরেকটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজ ‘রিচ স্ট্যারি’ অবরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথম জাহাজ হিসেবে প্রণালি অতিক্রম করে উপসাগর ছেড়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বলে তথ্য থেকে জানা গেছে।
এই জাহাজ ও এর মালিক প্রতিষ্ঠান সাংহাই শুয়ানরুন শিপিং কোম্পানি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘রিচ স্ট্যারি’ একটি মাঝারি আকারের তেলবাহী জাহাজ, যাতে প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল মিথানল রয়েছে। সর্বশেষ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দর থেকে এটি পণ্য বোঝাই করেছে।
চীনা মালিকানাধীন এই জাহাজটিতে চীনা নাবিকরা কাজ করছেন বলেও তথ্য থেকে জানা গেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে, ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন অবরোধ ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ ও এটি উত্তেজনা আরও বাড়াবে। তবে চীনা জাহাজগুলো প্রণালি অতিক্রম করছে কি না—সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) গ্রিনিচ সময় দুপুর ২টা থেকে অবরোধ শুরু হওয়ার পর আরও পাঁচটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে দুটি রাসায়নিক ও গ্যাসবাহী জাহাজ, দুটি শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ এবং ‘ওশান এনার্জি’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে, যা ইরানের বান্দার আব্বাস বন্দরে নোঙর করেছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দেখা মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলো এই অবরোধের আওতার বাইরে থাকবে।
ইতালির জেনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্যাব্রিজিও কোটিকিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের জাহাজ আটকে দিতে হবে না বা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করতে হবে না; তারা বিরতিসূচক অবরোধও চালাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জাহাজগুলোর ওপর হামলা হবে না, বরং তাদের দিক পরিবর্তন করে দেওয়া হবে ও উল্লেখ করেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ওমান উপসাগরে অবস্থান করবে।
শিল্প সূত্র জানায়, অবরোধ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধঝুঁকি বীমার খরচ বাড়েনি, তবে অতিরিক্ত সাপ্তাহিক খরচ এখনও কয়েক লাখ ডলারের মধ্যে রয়েছে। সাধারণত প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় এই বীমা কভার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।
জাহাজ দালাল প্রতিষ্ঠান বিআরএস এক প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা এখন এক সপ্তাহ আগের তুলনায় আরও দূরে সরে গেছে, বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধ শুরু করার পর।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, নিকট ভবিষ্যতে এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল খুবই কম বা প্রায় শূন্যে নেমে আসতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এসএএইচ