ইরান যুদ্ধের সময় ইরাকেও হামলা চালায় সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:০৭ পিএম, ১৪ মে ২০২৬
চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল ইরাকে ড্রোন হামলায় বিধ্বস্ত স্থাপনাগুলো দেখাচ্ছেন কুর্দিদের রাজনৈতিক দল কোমালা পার্টির এক সদস্য/ ছবি: এএফপি

ইরান যুদ্ধ চলাকালে ইরাকে তেহরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান। একই সময়ে কুয়েত থেকেও ইরাকের ভেতরে পাল্টা হামলা চালানো হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যে সামরিক প্রতিক্রিয়াগুলো সংঘাত চলাকালে অনেকটাই আড়ালে ছিল, এই হামলাগুলো তারই অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য রয়টার্স তিনজন ইরাকি নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তা, একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের একজন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের উত্তর সীমান্তসংলগ্ন ইরাকি এলাকায় ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি জানান, এসব হামলার কিছু অংশ ৭ এপ্রিল ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির সময়ের আশপাশে সংঘটিত হয়।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ঘাঁটি থেকে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছিল, সেগুলোই মূলত টার্গেট করা হয়।

ইরাকি সূত্রগুলো সামরিক মূল্যায়নের বরাতে জানিয়েছে, অন্তত দুই দফায় কুয়েতের ভূখণ্ড থেকে ইরাকে রকেট হামলা চালানো হয়।

তাদের দাবি, এপ্রিল মাসে দক্ষিণ ইরাকে চালানো এক দফা হামলায় কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হন। এছাড়া ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া কাতাইব হিজবুল্লাহ’র যোগাযোগ ও ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত একটি স্থাপনাও ধ্বংস করা হয়।

তবে রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি, কুয়েত থেকে ছোড়া রকেটগুলো কুয়েতি বাহিনী নাকি সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা নিক্ষেপ করেছিল।

এ বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে, কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় ও ইরাকি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইরানেও হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরব সবসময় উত্তেজনা হ্রাস, আত্মসংযম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিতের পক্ষে। তবে ইরাকে হামলার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।

এদিকে কাতাইব হিজবুল্লাহ’র একজন মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেননি।

মঙ্গলবার (১২ মে) রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়। সৌদি ভূখণ্ডে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটিই প্রথমবার, যখন রিয়াদ সরাসরি ইরানে আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে।

একইসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে অনুরূপ হামলা চালিয়েছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন। তবে সব সূত্রই বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করে যেসব শত শত ড্রোন হামলা চালানো হয়, তার বড় অংশই ইরাক থেকে পরিচালিত হয়েছিল।

যুদ্ধ চলাকালে মিলিশিয়াসংযুক্ত বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কুয়েতে হামলার দাবি জানিয়ে একাধিক বার্তা প্রকাশ করা হয়। যদিও রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ইরাক থেকে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলে ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি আরব ও কুয়েত মিলিশিয়াদের প্রতি ধৈর্য হারাতে শুরু করে। এসব মিলিশিয়ার অধীনে কয়েক হাজার যোদ্ধা রয়েছে, পাশাপাশি তাদের হাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্রভাণ্ডারও আছে।

যুদ্ধ চলাকালে সীমান্তপাড়ের হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে কুয়েত তিনবার দেশটিতে নিযুক্ত ইরাকি প্রতিনিধিকে তলব করে। পাশাপাশি ৭ এপ্রিল বসরায় কুয়েতি কনস্যুলেটে হামলার ঘটনাতেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

অন্যদিকে, সৌদি আরবও ১২ এপ্রিল ইরাকের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে হামলার প্রতিবাদ জানায়।

অবিশ্বাসে ভরা ইরাক-উপসাগরীয় সম্পর্ক

উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অবিশ্বাস ও সন্দেহে আবৃত। ১৯৯০ সালে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইন কুয়েত আক্রমণ করেন ও সৌদি আরব লক্ষ্য করে স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েন। সেই সময় থেকেই সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েক দশক ধরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকে।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ ওই হামলার পর তেহরানঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও সশস্ত্র সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে ইরাক ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

উপসাগরীয় দেশগুলো বহুবার বাগদাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে, তারা এসব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এসব গোষ্ঠী অনেকটাই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং সীমান্তপাড়ের হামলাও চালিয়ে থাকে।

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নতুন আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু নতুন যুদ্ধ সেই অগ্রগতিকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। একইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন এক সংঘাতে টেনে এনেছে, যেটি তারা এড়িয়ে চলতে চেয়েছিল।

দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও এক সরকারি নিরাপত্তা উপদেষ্টার তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সৌদি আরব ও কুয়েত কূটনৈতিক মাধ্যমে বাগদাদকে সতর্ক করেছিল, যাতে ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধ করে।

ইরাকি বাহিনী জানিয়েছে, তারা কিছু হামলার চেষ্টা প্রতিহত করেছে। এর মধ্যে বসরার পশ্চিমে সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার উদ্দেশ্যে রাখা একটি রকেট লঞ্চার জব্দ করার ঘটনাও রয়েছে।

তবে চারজন ইরাকি নিরাপত্তা সূত্র ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির দাবি, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা এখনো কুয়েত ও সৌদি সীমান্তজুড়ে নজরদারি ড্রোন উড়াচ্ছে। তাদের মতে, এসব ড্রোনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে তা ইরানকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, কোন জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোন স্থাপনা এখনো সচল আছে- তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করছে। তারা পরবর্তী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।